দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (৫ ডিসেম্বর)। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ দক্ষিণ আফ্রিকার এমভেজোর এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
বাবা নাম রেখেছিলেন রোলিহ্লাহলা ডালিভুঙ্গা মানডোলা। স্কুলের শিক্ষক তার ইংরেজি নাম রাখলেন নেলসন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘মাদিবা’।
কিংবদন্তিদের কিংবদন্তি ম্যান্ডেলা ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি উপনিবেশবিরোধী কার্যক্রম ও আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৪৩ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন ও ১৯৪৪ সালে ইয়ুথ লিগ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি সশস্ত্র সংগঠন উমখন্তো উই সিযওয়ের নেতা হিসাবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক জীবনের প্রথমভাগে তিনি মহাত্মা গান্ধীর দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী কর্মীরা আন্দোলনের প্রথম দিকে গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের নীতিকে গ্রহণ করে বর্ণবাদের বিরোধিতা করেছিল। ম্যান্ডেলাও প্রথম থেকেই অহিংস আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার ১৯৫৬ খ্রস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর তারিখে ম্যান্ডেলাসহ ১৫০ জন বর্ণবাদবিরোধী কর্মীকে দেশদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেপ্তার করে। এই মামলাটি সুদীর্ঘ ৫ বছর ধরে (১৯৫৬-১৯৬১) চলে, কিন্তু মামলার শেষে সব আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হন।
জীবনের ২৭টি বছর ম্যান্ডেলাকে কারাবাস করতে হয়। তার এই ২৭ বছর কারাজীবনের মধ্যে ১৮ বছরই তাকে কাটাতে হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত রোবেন দ্বীপের কারাগারে। তার হাত দিয়েই বর্ণবাদের অবসান ঘটে।
বহুবর্ণভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মহান এই নেতাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর জন্মদিন ১৮ জুলাইকে ম্যান্ডেলা দিবস ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। মানবাধিকার রক্ষায়ও ম্যান্ডেলার রয়েছে বিশেষ অবদান। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সাল থেকে জাতিসংঘ চালু করে নেলসন ম্যান্ডেলা পুরস্কার। বর্ণবাদবিরোধিতা তথা মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা নেলসন ম্যান্ডেলা ২৫০টিরও বেশি পুরস্কার পেয়েছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে শান্তির প্রতীক হিসেবে ডব্লিউ ডি ক্লার্কের সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান নেলসন ম্যান্ডেলা।
শেষ জীবনে এসে রোগব্যাধি বাসা বাঁধে তার শরীরে। ২০১৩ সালের ৮ জুন তিনি ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে প্রায় ২ মাস হাসপাতালে কাটান। ২১ সেপ্টেম্বর তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান সংগ্রামী। নেলসন ম্যান্ডেলাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- তিনি কীভাবে মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই আমার সম্পর্কে লোকে এমন কথাই বলুক, এখানে এমন এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে আছেন, যিনি পৃথিবীতে তার কর্তব্য সম্পাদন করেছেন।’
ডিবিসি/আরপিকে