দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে বাংলাদেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহ পরই তিনি দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। জরিপ অনুযায়ী, ৩০০ আসনের আইনসভায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বৃহস্পতিবারের সাধারণ নির্বাচনে প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই দেশের প্রথম নির্বাচন।
জানুয়ারির শুরুতে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং সামাজিক বিভাজন দূর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, “প্রথমত, আইনের শাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা। আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নীতি যা-ই হোক না কেন, দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।”
টাইম ম্যাগাজিনের সাথে বাংলাদেশের এই নতুন নেতার সাক্ষাৎকারের পাঁচটি মূল বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো-
জাতিকে নিরাময় ও ঐক্যবদ্ধ করা:
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। এছাড়া হাসিনার শাসনামলের শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এই ক্ষতগুলো এখনও দগদগে। তারেক রহমানকে সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, যা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুরোপুরি রাজনীতিকরণ করা হয়েছিল।
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকেই ঐক্যের বার্তা প্রচার করছেন এবং প্রতিশোধ পরায়ণ না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতিশোধ কোনো কিছু ফিরিয়ে আনবে না। বরং আমরা যদি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তবেই ভালো কিছু অর্জন সম্ভব।”
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার:
হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। যুব বেকারত্বের হার এখন ১৩.৫%। রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, যা জ্বালানি সরবরাহ এবং উৎপাদন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৪ কোটিরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপির অন্যতম প্রতিশ্রুতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তা প্রদান। এছাড়া তারেক রহমান ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সংযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাত উদারীকরণের পরিকল্পনা করেছেন। তিনি প্রবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন, যাতে তাঁরা বিদেশে ভালো বেতনের চাকরি পেতে পারেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন:
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং বাংলাদেশি পণ্যের শীর্ষ ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর জেরে গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল চুক্তি বাতিল করা হয় এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ঢাকা আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে।
তবে ভারত বিএনপির সাথে কাজ করতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত ডিসেম্বরের শেষে তারেক রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাথে বৈঠক করেন। তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুতে বিএনপি ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ পানি কনভেনশন সই করার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, হাসিনার আমলে ভারতের সাথে করা অনেক চুক্তিতে ‘ভারসাম্যহীনতা’ রয়েছে, যা সংশোধন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “অবশ্যই আমরা প্রতিবেশী। তবে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করাই প্রথম অগ্রাধিকার, এরপর আমরা সম্পর্ক এগিয়ে নেব।”
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে এবং প্রথমে ৩৭% শুল্ক আরোপ করলেও আলোচনার মাধ্যমে তা ১৯%-এ নামিয়ে আনা হয়। তারেক রহমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং শুল্ক সুবিধা পেতে বোয়িং বিমান এবং মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি।”
ইসলামপন্থী রাজনীতির ব্যবস্থাপনা:
নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি তাদের গঠনতন্ত্রে শরিয়াহ আইনের লক্ষ্য রাখলেও বর্তমানে উগ্রবাদী বক্তব্য কমিয়ে সামাজিক কল্যাণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে দলটির নেতার নারীবিদ্বেষী মন্তব্য নিয়ে অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় জামায়াতের প্রভাব কিছুটা সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে না যেতে সব গণতান্ত্রিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও ছাত্র আন্দোলন:
জুলাই বিপ্লবে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তবে বিপ্লব-পরবতী সময়ে ছাত্র আন্দোলন বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ছাত্রনেতাদের গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) জামায়াতের সাথে জোট করায় অনেক নারী ও সংখ্যালঘু সদস্য ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
সাবেক এনসিপি নেতা তাসনিম যারা, যিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন, বলেন, “আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে একটি প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্পের আশা আছে। তবে তা রাতারাতি তৈরি হবে না।” তারেক রহমান গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অনেক বড় দায়বদ্ধতা রয়েছে।”
সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন
ডিবিসি/এসএফএল