ফেনীর পরশুরামে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগ করা মসজিদের এক ইমাম অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) পিতা তার আপন বড় ভাই। ভাইকে বাঁচাতে পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এক মাসেরও বেশি সময় জেল খাটতে হয় ওই ইমামকে। এতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চরম অপমানের মুখে পড়তে হয় তাঁকে; হারাতে হয় চাকরিও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরী (১৪) ২০১৯ সালে স্থানীয় মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। এর পাঁচ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের (২৫) বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সামনে আসে এক ভয়ংকর সত্য। ওই কিশোরীর গর্ভের সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষায় জানা যায়, শিশুটির বাবা ওই মক্তবের শিক্ষক নন; বরং মেয়েটির আপন বড় ভাই। পরে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ভাই নিজেও বোনকে জোরপূর্বক ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।
ফরেনসিক পরীক্ষায় পরশুরামের বক্সমাহমুদে ধর্ষণের শিকার সেই কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে তাঁর আপন বড় ভাইয়ের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। আর এই অপরাধের দায় থেকে ভাইকে বাঁচাতে ফাঁসানো হয়েছিল স্থানীয় মসজিদের ওই ইমামকে। এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর অবশেষে মিথ্যা এই ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এ অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে ১ মাস ২ দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান মোজাফফর।
এ মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফর আহমদ ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএর সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ডিএনএ রিপোর্টে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএর মিল না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ওই কিশোরীকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে স্বীকারোক্তি দেয় যে, তার আপন বড় ভাই মোরশেদ তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে। ঘটনা আড়াল করে ভাইকে বাঁচাতেই শিক্ষক মোজাফফরকে ফাঁসানো হয়।
পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন মোরশেদ।
আদালতে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তান জান্নাতুল ফেরদাউস ও বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা একই বছরের ৪ আগস্ট ঢাকায় পুলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ভিকটিমের সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকন্যা জান্নাতুল ফেরদাউসের সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা মিলে গেছে, অর্থাৎ মোরশেদই শিশুটির জৈবিক পিতা।
ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, জান্নাতুল ফেরদাউসের পিতা হিসেবে মোরশেদের ডিএনএর ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপুলিশ পরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমেদের বিরুদ্ধে আনীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ধর্ষণ মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মোরশেদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় একই ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে, আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট উপস্থাপনের পর মিথ্যা মামলায় এক মাস দুই দিন কারাভোগ করা মোজাফফর জামিনে মুক্তি পান।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করেছে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জশিট থেকে মোজাফফরের নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক ছিলেন মোজাফফর আহমেদ। এ ঘটনার পর মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান তিনি। মামলার খরচ জোগাতে ৫ শতক জমি বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে। প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন। এসব কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই গ্রামের আবুল বশরের ছেলে মোজাফফর আহমেদ।
মোজাফফর আহমদ বলেন, অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এ ঘটনায় আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছি। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশের মূল্যবান জায়গা বিক্রি করে দিয়েছি, আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে।
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, সুন্নি, কওমি বা সরকারি বুঝি না, তিনি একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। ক্ষতিগ্রস্ত এই ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাঁকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও আইনি সহযোগিতা করা উচিত।
ডিবিসি/কেএলডি