ফরিদপুরের নগরকান্দায় ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার দাবি করা এক কিশোরীকে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগে রুমন খন্দকার (২১) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত প্রায় দেড় মাস ধরে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
তবে রুমনের পরিবারের দাবি, চলতি বছরের ২২ মে দুই পরিবারের সম্মতিতে সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিতে ওই কিশোরীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়েতে গায়ে হলুদ, বরযাত্রী, খাওয়া-দাওয়া ও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাসহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছিল। কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় বিয়েটি নিবন্ধন করা হয়নি বলেও দাবি তাদের।
অন্যদিকে, কিশোরী ও তার পরিবারের দাবি, কোনো বিয়ে হয়নি। তাদের অভিযোগ, গত ১৯ জুন কিশোরীকে অপহরণ করে রুমনদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এ অভিযোগে ২ জুলাই নগরকান্দা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন কিশোরীর দাদি জহুরন খাতুন (৫২)।
রুমন খন্দকার নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি।
রুমনের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২২ মে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুব্বরের মেয়ে মিলার সঙ্গে রুমনের সামাজিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়েতে প্রায় ৪০ জন বরযাত্রী অংশ নেন। পরে কনের বাড়ি থেকেও প্রায় ২৫ জন অতিথি রুমনের বাড়িতে যান। বিয়ের বিভিন্ন আয়োজনের ছবি ও ভিডিও তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, বিয়ের পর থেকেই নবদম্পতির মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় কয়েকবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কিশোরী আর রুমনের বাড়িতে ফিরতে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে বিষয়টি থানায় গড়ায় বলে তার দাবি।
তিনি আরও বলেন, গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ রুমনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন থানায় গিয়ে তারা জানতে পারেন, ধর্ষণের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে মামলার বাদী জহুরন খাতুন ও কিশোরী বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, গত ১৯ জুন বিকেল ৫টার দিকে বাড়ির পাশ থেকে কিশোরীকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করা হয়। পরে রুমনদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাতভর ধর্ষণ করা হয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়।
পরদিন সেখান থেকে পালিয়ে এসে পরিবারকে বিষয়টি জানায় কিশোরী। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, ২ জুলাই কিশোরীকে সঙ্গে নিয়ে তার দাদি থানায় আসেন এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেন। সেখানে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ থাকায় লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করা হয়।
ওসি বলেন, মামলার এজাহারে বিয়ের কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি এবং পুলিশকেও আগে এ বিষয়ে জানানো হয়নি। কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় আইনগতভাবে বিয়ের সুযোগ নেই। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহম্মদ আল ফাহাদ বলেন, কিশোরীর পরিবার চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ থানায় অভিযোগ করায় মামলা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তদন্ত কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে মামলার অগ্রগতি জানাচ্ছেন।
এদিকে, বিয়েটি নিবন্ধিত না হওয়ায় ঘটনাটির প্রকৃত ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রুমনের পরিবার দাবি করেছে, কিশোরীর বয়স কম হওয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়ে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত ছিল দুই পরিবারের। তবে ডাঙ্গী ইউনিয়নের কাজী মৌলভী বিএম ফজলুর রহমান মণ্ডল এ বিয়ের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না এবং কনের বাড়িতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ১৮ বছরের কম বয়সী কারও বিয়ে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে একই সঙ্গে কোনো ঘটনার প্রকৃত তথ্য নির্ধারণে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষার জন্য নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য, কিশোরীর বয়স কম হলে বাল্যবিয়ের বিষয়টিও আইনের আওতায় আসতে পারে। কোনো বিয়ে নিবন্ধক এ ধরনের বিয়েতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্তে বিয়ে, অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডিবিসি/এসডব্লিউএন