১৫ বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়া, ওয়ান-ইলেভেনের কারানির্যাতন, পঙ্গুত্ব বরণ আর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন সব মিলিয়ে তারেক রহমানের জীবন যেন এক হার না মানা মহাকাব্য। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতিতে তার পদার্পণ অনেকটা রাজকীয় হওয়ার কথা থাকলেও, গত দেড় দশকের পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। দীর্ঘ নির্বাসন, অমানবিক শারীরিক নির্যাতন এবং নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ গড়ার হাল ধরেছেন।
তারেক রহমানের ধমনীতে বইছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের রক্ত। শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল সমীকরণ। তবে তিনি শুধু পারিবারিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বগুড়া থেকে রাজনীতির মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেন। মূলত ২০০২ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশব্যাপী 'তৃণমূল সম্মেলন'-এর মাধ্যমে তিনি দলের ভেতরে ব্যাপক সংস্কার ও প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে আসেন।
রাজনীতির মাঠ তার জন্য কখনো মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কারাবরণকালে তিনি ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, যা তাকে পঙ্গুত্বের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমানোর পর শুরু হয় দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসিত জীবন। প্রবাসে নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেই হারান আদরের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে।
মামলা, দণ্ড, দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে তিনি কার্যত নির্বাসিত জীবন কাটান। তবুও রাজনীতি ছাড়েননি তারেক রহমান। প্রায় ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এক অভূতপূর্ব পরিবেশে দেশে ফিরে আসেন তারেক রহমান। সেদিন রাজধানীর রাজপথে লাখ লাখ মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
তবে এই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় হারান মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়াকে। একদিকে মাতৃহারা হওয়ার ব্যক্তিগত শোক এবং অন্যদিকে দলের বিশাল দায়িত্ব, এই দুইয়ের কঠিন ভার কাঁধে নিয়েই তারেক রহমান সামনের দিকে এগিয়ে যান। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে দল পুনর্গঠন, জোট সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তৈরির মাধ্যমে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
নির্বাচনী লড়াইয়ে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নামে বিএনপি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেলেণ ভূমিধস বিজয়। ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি জোট এক বিশাল বিজয় অর্জন করে। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর তারেক রহমান সংসদ নেতা ও বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কৈশোরে পিতৃহারা হওয়া, যৌবনে কারাবাস আর মধ্যবয়সের দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে তিনি আজ রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষে।
নির্বাসিত জীবনে যার শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকেই, সেই তারেক রহমানের কাঁধেই আজ সওয়ার বাংলাদেশ!
ডিবিসি/এফএইচআর