আন্তর্জাতিক, আরব

নেতানিয়াহুর ‘ভ্রান্ত ধারণার’ ফাঁদে ওয়াশিংটন: কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

২ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

সাবেক কাতারি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ কোনো আকস্মিক উত্তেজনা নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যকে সহিংসভাবে পুনর্গঠন করার একটি দীর্ঘমেয়াদী ইসরায়েলি এজেন্ডার চূড়ান্ত রূপ।

আল জাজিরার আল মুকাবালা অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রবীণ এই কূটনীতিক বর্তমান ভূ-রাজনীতি, হরমুজ প্রণালির সংকট এবং একটি ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা জোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সোজাসাপ্টা বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।


শেখ হামাদ দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন একটি কট্টরপন্থী গোষ্ঠী ১৯৯০-এর দশক থেকেই ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকাকে যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনকে একটি 'ভ্রান্ত ধারণা'র ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধে নামিয়েছেন। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানি সরকারের পতন ঘটবে।


তিনি আরও বলেন, আমেরিকার প্রকৃত শক্তি সামরিক শক্তি ব্যবহারের মধ্যে নয়, বরং তা এড়ানোর সক্ষমতার মধ্যে নিহিত ছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় আরও দুই সপ্তাহ আলোচনা চললে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব ছিল বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এই যুদ্ধের একমাত্র সুবিধাভোগী নেতানিয়াহু, যিনি এখন তার বৃহত্তর ইসরায়েল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ খুঁজছেন।


যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলপথকে ইরান যেভাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, তাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক ফলাফল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শেখ হামাদ। তিনি বলেন, ইরান এখন এই আন্তর্জাতিক জলপথকে নিজস্ব সার্বভৌম অঞ্চল হিসেবে গণ্য করছে। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।


সাক্ষাৎকারে তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোতে ইরানের হামলার কঠোর নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এর ফলে ইরানের প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোর জনগণের আস্থা ও সহানুভূতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ভূ-রাজনীতির প্রয়োজনে তিনি ইরানের সাথে একটি ফ্রাঙ্ক ও সম্মিলিত সংলাপের ওপর জোর দেন।


উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান বা ইসরায়েল নয়, বরং নিজেদের অনৈক্য-এমনটিই মনে করেন শেখ হামাদ। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি একটি গালফ ন্যাটো গঠনের প্রস্তাব দেন, যার মেরুদণ্ড হবে সৌদি আরব। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে এই জোটের নিজস্ব আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকবে।


তিনি সতর্ক করেন যে, আমেরিকা এখন এশিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, তাই উপসাগরীয় দেশগুলো আর অনন্তকাল মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার নিচে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে না। বিকল্প হিসেবে তিনি তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।


গাজায় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডকে নৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েল গাজাকে জনশূন্য করে এটিকে একটি রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো রাজনৈতিক নিশ্চয়তা ছাড়া হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।


একই সঙ্গে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের রোডম্যাপ ছাড়া ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অনড় অবস্থানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি নেতানিয়াহুর হিসাব নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে।


সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, বিপ্লবের শুরুতেই তিনি আসাদকে জনগণের কথা শোনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।


সাক্ষাৎকারের শেষে শেখ হামাদ একটি ঐতিহাসিক গোপন তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ক্লিনটন প্রশাসনের একটি বার্তা নিয়ে তিনি তেহরান গিয়েছিলেন। আমেরিকা তখন দাবি করেছিল যে ইরান যেন তাদের প্রাথমিক পারমাণবিক কর্মসূচি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করে অথবা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসে। যদিও কাতার শুধু বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছিল, ইরান তখন কাতারকে আমেরিকার পক্ষ হিসেবেই দেখেছিল।


ডিবিসি/এসএফএল

আরও পড়ুন