দ্য ডেইলি সাবাহ নিউজের দেওয়া তথ্যমতে, আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের টিএফ (কেএএএন) মাল্টিরোল/ এয়ার সুপিউরিটি স্টেলথ যুদ্ধবিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়। মূলত তুরস্কের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তার্কিস অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিআইএ) এর ডিজাইনকৃত টিএফ (কেএএএন) যুদ্ধবিমানের সফল উড্ডয়ন তুরস্কের নিজস্ব অ্যাভিয়েশন প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। তার পাশাপাশি স্টেলথ প্রযুক্তি সমৃদ্ধ নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির মাত্র পাঁচটি দেশের এলিট ক্লাবে প্রবেশ করল তুরস্ক।
মূলত আজ একজন পাইলট চালিত এই নতুন প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানটি পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক স্বল্প সময়ের জন্য আকাশে উড্ডয়ন করে আবার নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করে। এর মাধ্যমে তুরস্ক এবার অ্যাভিয়েশন সেক্টরে এক নতুন মাইলফলক অর্জন করল। অবশ্য এটি পুরোপুরি সার্ভিসে আসতে আগামী ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তবে দেশটি বর্তমানে নতুন প্রজন্মের নিজস্ব অ্যাভিয়েশন টেকনোলজি অর্জনে কোনো রকম ছাড় দিতে নারাজ। তাছাড়া তারা ইতোমধ্যেই বিশ্বমানের বিভিন্ন সিরিজের কমব্যাট অ্যান্ড নন-কমব্যাট (ইউএভি) ড্রোন যুদ্ধ ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবহার করে সারা বিশ্বে সারা ফেলে দিয়েছে।
তুরস্ক তার উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হিসেবে শতভাগ দেশীয় প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই যুদ্ধবিমানের প্রোডাকশন লাইন চালু করার আগে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আধুনিকায়ন ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটিকে আরও আপডেট করে তৈরি করতে চায়। তার্কিস অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ (টিআইএ) এই যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন হিসেবে আপাতত আমেরিকার তৈরি ২টি জেনারেল ইলেক্ট্রিক এফ-১১০-জিই-১২৯ আফটার টার্বোফ্যান ইঞ্জিন ব্যবহার করছে। তবে গণ উৎপাদনের আগেই নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তির তৈরি জেট ইঞ্জিন ব্যবহারের বিষয়ে প্রবলভাবে আশাবাদী প্রতিষ্ঠানটি।
আসলে ১.৮ ম্যাক গতির এই যুদ্ধবিমানের অ্যাডভান্স ইঞ্জিন ১৩ হাজার কেজি থ্রাস্ট উৎপন্ন করে এবং এর ম্যাক্সিমাম পে-লোড ক্যাপাসিটি ৩ হাজার কেজির কাছাকাছি হতে পারে। তাছাড়া এটিকে আকাশের সর্বোচ্চ ১৭,০০০ মিটার উচ্চতায় উড্ডয়নের উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে। এর সর্বোচ্চ পে-লোড ক্যাপাসিটি ঠিক কত হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানা সম্ভব না হলেও মনে করা হয় এটিতে আনুমানিক ৩ হাজার কেজি পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তির এয়ার টু এয়ার মিসাইল ও এয়ার টু গ্রাউন্ড মিসাইলের পাশাপাশি গাইডেড অ্যান্ড আনগাইডেড বোম্বস ব্যবহার করতে চায় তুরস্কের বিমান বাহিনী।
তুরস্ক গত ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর তাদের উচ্চাভিলাষী টুইন ইঞ্জিনের টিএফ-এক্স নতুন প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার জেট প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করে। এই প্রজেক্টে পর্যায়ক্রমে দেশের সকল ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যাভিয়েশন টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে দেশটির সম্মানিত এরদোয়ান সরকার। বিশেষ করে এই প্রজেক্টের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রয়েছে তার্কিস এ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই)। বর্তমানে এর পাশাপাশি তার্কিস টেক জায়ান্ট রকেটসান, এসটিএম, এ্যাসেলসাল, বায়কার, হেভেলসানসহ সকল তার্কিস কোম্পানিকে এই প্রজেক্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তার্কিস অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই) টিএফ-এক্স প্রজেক্টের প্রথম এয়ারক্রাফট হিসেবে (কেএএএন) এর প্রোটোটাইপ কপি তৈরি সম্পন্ন করে গত ২০২১ সালের ৪ঠা নভেম্বর। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে প্রথম ব্যাচে আনুমানিক ১০টি নতুন প্রজন্মের স্টেলথ মাল্টিরোল/ এয়ারসুপিউরিটি যুদ্ধবিমান তুরস্কের বিমান বাহিনীকে সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে তুরস্কের বিমান বাহিনীতে ২৪৫টি এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন এবং ৪৮টি পুরোনো এফ-৪ ফ্যান্টম যুদ্ধবিমান ব্যতীত আপাতত শক্তিশালী আর কোনো যুদ্ধবিমান নেই। তাই অদূর ভবিষ্যতে একেবারে নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তির তৈরি যুদ্ধবিমান দ্বারা এই ঘাটতি পূরণে অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
তাছাড়া আগামী ২০২৯ সাল থেকে প্রতি মাসে ২টি করে এই জাতীয় যুদ্ধবিমান উৎপাদন করবে তার্কিস এ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই)। তুরস্কের নতুন এই প্রজেক্টটি এখনও পর্যন্ত গবেষণা ও উন্নয়নের স্তরে রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে এতে নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং অস্ত্র সংযোজন করা হবে। বিশেষ করে গত ২০১৯ সালে আমেরিকার এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার জেট প্রজেক্ট থেকে তুরস্ককে বের করে দিলে দেশটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজস্ব প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান ডিজাইন ও তৈরিতে মনোনিবেশ করে। আর এক্ষেত্রে দেশটি এবার তার নিজের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সফলতার বিষয়টি ইতোমধ্যেই বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
লেখক: সিরাজুর রহমান, সহকারী শিক্ষক ও লেখক, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।