আন্তর্জাতিক, এশিয়া

পর্বতমালা, মরুভূমি ও সাগর: প্রকৃতিই যেন ইরানের রক্ষক!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

৫ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

ইরানের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি এখন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে স্থল অভিযানের হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের সুবিশাল পর্বতমালা, বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং দুই প্রান্তের সমুদ্র দেশটির জন্য এক অজেয় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেকোনো আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য যমদূত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রগুলোতে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালির আশেপাশে নৌযান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তেহরান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন এ পথ পুনরায় উন্মুক্ত করতে সামরিক চাপ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করলেও সমরবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই সংকীর্ণ জলপথে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে।

 

স্থলপথে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির বিশাল আয়তন এবং দুর্ভেদ্য পাহাড়ী এলাকা। উত্তর-দক্ষিণ জুড়ে বিস্তৃত জাগ্রোস এবং আলবোরজ পর্বতমালা যেকোনো আধুনিক সেনাবাহিনীকে ধীর করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ২০০৩ সালের ইরাক অভিযানের তুলনায় ইরান অনেক বেশি জটিল প্রতিপক্ষ। দেশটির আয়তন ইরাকের চেয়ে প্রায় চার গুণ বড় এবং এর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো পাহাড়ের গভীরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে লুকানো রয়েছে।

 

দক্ষিণের কৌশলগত দ্বীপগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও পেন্টাগন চরম দোটানায় রয়েছে। খারগ বা হরমুজ প্রণালির দ্বীপগুলো দখল করা হয়তো অসম্ভব নয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় সেগুলো দখলে রাখা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সামরিক বিশেষজ্ঞ আরমান মাহমুদিয়ানের মতে, ইরান কৌশলগত কারণে হয়তো শুরুতে দ্বীপগুলো ছেড়ে দেবে এবং পরবর্তীতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর বিধ্বংসী আক্রমণ চালাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক মরণফাঁদ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। 

 

অন্যদিকে, পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহারের যে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, সেটিও খুব একটা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইরানের নিজস্ব বাহিনী ইতিমধ্যে সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়ে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে দুর্গম পাহাড়ী পথে অনুপ্রবেশ করা বিদেশি মদতপুষ্ট যোদ্ধাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ঐতিহাসিকভাবে ইরান কোনো ভূখণ্ড দখল থাকা অবস্থায় কখনোই আলোচনায় বসতে রাজি হয় না। আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, চরম সংকটের মাঝেও তেহরান আলোচনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল, যতক্ষণ না তাদের মাটি থেকে শত্রু বাহিনী পুরোপুরি বিদায় নিয়েছিল। বর্তমান সংঘাতের ক্ষেত্রেও একই তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনা কাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতানকা মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এখন কেবলই দুরাশা। সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলা বা গুপ্তহত্যার পরও তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোতে কোনো ফাটল ধরেনি; বরং এই বাহ্যিক চাপ ইরানের জনমানসে বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ ক্ষোভ তৈরি করছে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেরই ইঙ্গিত দেয়।

 

সামগ্রিকভাবে, ইরানের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এখন দেশটির সামরিক শক্তির চেয়েও বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মরুভূমি, বরফে ঢাকা উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এবং গভীর সমুদ্র উপকূল একযোগে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর সামনে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। এই চরম বৈরী পরিবেশে একটি কার্যকর স্থল অভিযান চালানো এবং তাতে জয়ী হওয়া আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগেও এক বিশাল অনিশ্চয়তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

 

ডিবিসি/এএমটি

আরও পড়ুন