পাইলসকে ডাক্তারি ভাষায় হিমোরয়েডস বলে। কবিরাজরা পাইলসকে বলেন অশ্বগেজ। পাইলস হলে আমরা ঘাবড়ে যাই। চলুন, পাইলস সর্ম্পকে কিছু জরুরি বিষয় জেনে নিই।
১. পাইলস কি?
রেকটামের রক্তনালীগুলো কুশনের কাজ করে।এতে সংক্রমণ হয়ে স্ফীত হয়ে যাওয়াকে পাইলস বলে।
২. ফিসার কী? পায়খানার রাস্তা ছিঁড়ে যাওয়াকে এনাল ফিসার বলে।
৩. পাইলস হলে কী করে বুঝবো? পায়খানার আগে বা পরে রক্ত যাওয়া পায়খানা করতে কষ্ট হওয়া পায়খানার রাস্তায় কিছু একটা অনুভব হওয়া পায়খানার রাস্তায় অস্বস্তিবোধ,চুলকানো
৪. ফিসার হলে কী করে বুঝবো? পায়খানা করতে কষ্ট হওয়া পায়খানার রাস্তায় ব্যথা হওয়া,কাঁটা কাঁটা লাগা পায়খানার সাথে বা ব্যবহৃত টিস্যু্তে রক্ত লেগে থাকা পায়খানার রাস্তার বাইরে চামড়ার মতো কিছু একটা অনুভূত হওয়া পায়খানার রাস্তা টাইট লাগা, পায়খানা কষা হওয়া
৫. পাইলস বা ফিসার হলেই কি অপারেশন করতে হয়? না, পাইলস আর ফিসারের প্রাথমিক চিকিৎসা ঔষধের মাধ্যমেই করা হয়।এসব রোগের চিকিৎসার অন্যতম শর্ত যেকোনো মূল্যে পায়খানা নরম রাখা।
৬. পাইলস হলে কী কবিরাজের কাছে যাব? যদি সুস্থ হতে চাও,তাহলে ভুলেও যাবে না। আয়ুর্বেদিক বা কবিরাজি বা বনেজী চিকিৎসায় লতাপাতার সাথে পায়খানার রাস্তায় এসিড ব্যবহার করা হয়। সাময়িক আরাম পেলেও পরবর্তীতে প্রচন্ড ব্যথা, পায়খানার রাস্তা সরু হয়ে যাওয়াসহ মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।
৭. গোপন জায়গা, লজ্জার জন্য মেয়েরা কি গাইনী ডাক্তারের কাছে যাবে? অবশ্যই না। গাইনী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন পায়খানার রাস্তার রোগের চিকিৎসা করেন না।
৮. তাহলে কার কাছে যাব? এ রোগের চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন সার্জারী বিশেষজ্ঞ বা কোলোরেক্টাল সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। পায়খানার রাস্তা ভালোভাবে না দেখে এ রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এ রোগ নির্ণয় করতে পায়খানার রাস্তায় আঙুল পরীক্ষা ও প্রক্টোস্কপি( Proctoscopy) পরীক্ষা করতে হয় যা শুধু মাএ সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাই করেন।
৯. পাইলস আর ফিসার রোগে কখন অপারেশন করতে হয়? * ৩য় ডিগ্রি ( কোথ দিলে পাইলস বের হয়ে আসে। আঙুল দিয়ে আবার ভেতরে ঢুকানো যায়) বা ৪র্থ ডিগ্রি পাইলস ( যখন পাইলস পায়খানার রাস্তার বাইরে সবসময় বের হয়ে থাকে) * ২য় ডিগ্রি পাইলস (যখন ঔষধের চিকিৎসায় উন্নতি হয় না) * এনাল ফিসার যদি ক্রনিক হয় (Chronic anal fissure),পায়খানার রাস্তা অনেক টাইট থাকে,পায়খানার রাস্তার সাথে একটা চামড়ার মতো থাকে( Sentinel tag)।
১০. কী ধরনের অপারেশন পদ্ধতি আছে?
কনভেনশনাল কেটে করা পদ্ধতি: লোংগো (LONGO) মেশিনের মাধ্যমে পায়খানার রাস্তা না কেটে অপারেশন। লেজার পদ্ধতিতে না কেটে অপারেশন
১১. কোন পদ্ধতি ভালো? চয়েজ ও আর্থিক সামর্থ্যের উপর ভালো নির্ভর করে। কেটে করা পদ্ধতিতে খরচ কম। কিন্তু ঘা শুকাতে সপ্তাহ দুয়েকের মতো পানিতে ছেক দিতে হয়। লোংগো পদ্ধতিতে কাঁটাছেড়া নেই। তাই পানিতে ছেক দিতে হয় না। এটা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পদ্ধতি। কিন্তু খরচ বেশি। লেজার পদ্ধতিতে ও পানিতে ছেক দিতে হয় না। কিন্তু খরচ বেশি। পুনরায় হবার সম্ভাবনা লোংগো পদ্ধতির চেয়ে বেশি। তবে যে পদ্ধতিতেই অপারেশন করা হোক না কেন,অপারেশন পরবর্তী সময়ে খাদ্যভ্যাস ও জীবন যাপন পদ্ধতি পরিবর্তনের উপর অপারেশনের সফলতা নির্ভর করে।
১২. কী করে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়? যে কোনো মূল্যে পায়খানা নরম রাখা। প্রচুর পরিমাণে পানি ও শাকসবজি খাওয়া। প্রতিদিন খাবারের পর ইসুফ গুলের ভূসি খাওয়া। চর্বি ও চর্বি জাতীয় খাবার খাবার তালিকা হতে যথাসম্ভব বাদ দেয়া। আঁশজাতীয় খাবার,ফলমূল বেশি খাওয়া। ফাস্টফুড ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা। প্রতিদিন নিয়মিত টয়লেট করার অভ্যাস গড়ে তুলা। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করা। যে কোনো মূল্যে ধূমপান পরিহার করা।
১৩. ভয়ের কিছু আছে? পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া মানেই পাইলস না। পায়খানার রাস্তার ক্যান্সারে ও পায়খানার সাথে রক্ত যায়। তাই পায়খানার রাস্তার যে কোনো সমস্যাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ভয় আর লজ্জা ( বিশেষ করে মেয়েদের) এ রোগের চিকিৎসায় বড় অন্তরায়। চিকিৎসার স্বার্থে ভয় আর লজ্জাকে জয় করতে হবে।
পরামর্শে: ডা. মো: আবু বকর ছিদ্দিক ফয়সল এমবিবিএস, বিসিএস(স্বাস্থ্য) এফসিপিএস ( সার্জারী) কনসালটেন্ট সার্জারী জেনারেল, ল্যাপারোস্কপিক,কোলোরেক্টাল ও ব্রেস্ট সার্জারী বিশেষজ্ঞ।
ডিবিসি/কেএমএল