মহাকাশ গবেষণায় এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সূচনা করে পৃথিবী থেকে মাত্র ৪০ আলোকবর্ষ দূরে মীন নক্ষত্রমণ্ডলে একটি নতুন এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (টেস) দ্বারা প্রথম শনাক্ত হওয়া এই গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্লিসা ১২ বি’ (Gliese 12 b)। ২০২৪ সালে প্রাথমিক শনাক্তকরণের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা স্বাধীনভাবে এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন, যা বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
এই গ্রহটি তার মাতৃ-নক্ষত্র ‘গ্লিসা ১২’-কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। নক্ষত্রটি একটি লোহিত বামন শ্রেণির, যা আকারে সূর্যের তুলনায় মাত্র ২৪ থেকে ২৭ শতাংশ এবং এর তাপমাত্রা সূর্যের চেয়ে অনেকটাই কম। গ্লিসা ১২ বি গ্রহটি তার নক্ষত্রের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করলেও নক্ষত্রটি শীতল হওয়ায় গ্রহটি মূলত একটি ‘টেম্পারেট জোন’ বা সহনীয় তাপমাত্রার অঞ্চলে অবস্থান করছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্রহটির ব্যাসার্ধ পৃথিবীর প্রায় ০.৯৬ গুণ এবং ভর পৃথিবীর ০.৯৫ গুণ, যা একে একটি পাথুরে গ্রহ হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কক্ষপথের হিসেবে দেখা গেছে, এই এক্সোপ্ল্যানেটটি মাত্র ১২.৮ দিনে তার নক্ষত্রকে একবার পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে। গ্রহটির পৃষ্ঠের আনুমানিক তাপমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তবে এটি নির্ভর করছে সেখানে বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতির ওপর।
যদি এই গ্রহে উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল থাকে, তবে সেখানে পানি তরল অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রাণের বিকাশের জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন গবেষকরা। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে গ্রহটি পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য নাকি শুক্র গ্রহের মতো চরম উত্তপ্ত।
মহাজাগতিক স্কেলে ৪০ আলোকবর্ষ দূরত্বকে সংক্ষিপ্ত মনে করা হলেও, বর্তমান মানব সভ্যতার প্রযুক্তিতে সেখানে পৌঁছাতে কয়েক লক্ষ বছর সময় লেগে যাবে। ১৯৯৫ সালে প্রথম বহির্গ্রহ আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে নাসা এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার এক্সোপ্ল্যানেট তালিকাভুক্ত করেছে।
তবে গ্লিসা ১২ বি-র মতো পৃথিবীসদৃশ এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব এবং পৃথিবীর বাইরে মানুষের বিকল্প আবাসের সন্ধানে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
সিরাজুর রহমান,
শিক্ষক ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি লেখক
ডিবিসি/টিবিএ