কৃষি

পোল্ট্রি উন্নয়নের খসড়া নীতিমালা নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ

ডেস্ক রিপোর্ট

ডিবিসি নিউজ

৫ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

‘পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাঁরা দাবি করছেন, নীতিমালাটি হুবহু বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তাস্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনসহ পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এই উদ্বেগের বিষয়টি জানা যায়। চলতি মাসের ১৩ তারিখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে।

 

খসড়া নীতিমালার ৫.৮.১.২ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। কেবল একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে।’ 

 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানোই এই নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তবে দেশে একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন এখনো সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো একটিতে বার্ডফ্লু বা বড় ধরনের রোগ সংক্রমণ দেখা দিলে উৎপাদন কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় বাচ্চা সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বাচ্চা আমদানির পথ খোলা থাকে, তবে সংকটকালে কয়েকটি কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারবে না। পাশাপাশি সংকটময় মুহূর্তে বাচ্চার দরকার হলেই হুট করে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা সম্ভব হবে না। কেননা, আমদানির এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেশ সময়ের প্রয়োজন হয়।

 

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত না করে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে দেশে ডিম ও মুরগির মাংসের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে; যা সরাসরি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ডিম ও মুরগির মাংস দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। বাচ্চার সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। এতে ডিম ও মুরগির মাংসের দাম বেড়ে গেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রোটিন গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। জরুরি প্রয়োজনে বাচ্চা বা প্যারেন্ট স্টক আমদানির প্রয়োজন হলেও তা দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে করতে হয়। ফলে আকস্মিক সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে আমদানির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা কার্যকরভাবে সম্ভব হয় না। একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা হলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

 

পোল্ট্রি প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিস্ট কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, ‘এই নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে ত্রিমুখী একটা সংকট তৈরি হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন প্রান্তিক খামারি ও ভোক্তারা। এই নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে একটা গণশুনানি করা প্রয়োজন, যেখানে সব স্টেকহোল্ডার অংশগ্রহণ করে তাঁদের মতামত দেবেন। তারপর বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এটি অনুমোদন দেওয়া উচিত। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্পে এমন একটি নীতিমালা করা উচিত হবে না, যা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে খামারিদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে—এমন কিছুই করা উচিত হবে না। আমদানি নিষিদ্ধের দিকে নজর না দিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রান্তিক খামারিদের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

 

পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, নীতিমালা প্রণয়নের আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আয়োজিত একাধিক বৈঠকে তাঁরা একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি বন্ধ না করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সে সময় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী খাদ্যনিরাপত্তা ও ভোক্তাস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দিলেও চূড়ান্ত খসড়ায় নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় তাঁরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী করা হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা হবে।

 

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমদানি বন্ধ করার আগে আমাদের সংকটকালে সমস্যা তৈরি হওয়ার শঙ্কা আছে কি না এবং যদি শঙ্কা থাকে, তবে তার বিকল্প কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে—সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব অংশীজনের যেন ইতিবাচক মত থাকে, সেটাও অবশ্যই দেখতে হবে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর কাঠামো নিশ্চিত না করা হলে নীতির লক্ষ্য অর্জনের বদলে পোল্ট্রি শিল্প, খামারি ও ভোক্তা—সবাই চাপের মুখে পড়তে পারেন।’

 

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেন, ‘সামগ্রিক পোল্ট্রি খাতের উন্নয়ন যেন হয়, সেই আলোকেই নীতিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে দেশের পোল্ট্রি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে বলেই মনে করি।’

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালায় পোল্ট্রির বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বা তেমন কোনো বার্তা নেই। একদিনের বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ হলে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান যদি সিন্ডিকেট করে, তা মোকাবিলার কোনো সুস্পষ্ট পরামর্শ বা নির্দেশনাও নেই। সব মিলিয়ে এ নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে খাতসংশ্লিষ্টরা খুব ভালো কোনো সুবিধা পাবেন না। বরং একদিনের বাচ্চা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষেত্রবিশেষে আমদানির লেজুড় জুড়ে দেওয়ায় সমালোচনা এবং বাজারে বাচ্চা সরবরাহে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এত বড় শিল্পের জন্য নীতিমালাটি যেন যুগোপযোগী হয়, সেটিকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিবিসি/কেএলডি

আরও পড়ুন