বর্তমানে বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI)। বিশেষ করে এসব দেশে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাত শক্তিশালীকরণে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি FDI আকর্ষণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭৫.৪ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন (১৩৬.৩ বিলিয়ন ডলার) এবং হংকং (১০৪.৩ বিলিয়ন ডলার)।
আসলে, বর্তমানে বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং ও সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন এবং বাণিজ্য বাধা বৃদ্ধির কারণে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে বিনিয়োগের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। FDI প্রাপ্তির দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ দশের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড ও ভারত।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে ৭১ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতে ৩৯ বিলিয়ন ডলারের FDI প্রবেশ করেছে, যা তাদের শিল্প উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে স্থানীয় দক্ষ জনশক্তি, বিনিয়োগ নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং কাঁচামালের সহজলভ্যতার জন্য আজ এই দেশগুলো বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এদিকে, বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীন তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত FDI আকর্ষণে এগিয়ে থাকলেও পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে নেট FDI অত্যন্ত সীমিত রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নেট FDI ৩৯.৩৬% বৃদ্ধি পেয়ে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১.২৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে প্রতি বছর গড়ে ৮-১০ বিলিয়ন ডলারের FDI প্রয়োজন, যা বর্তমান অবস্থা থেকে অনেক দূরে।
তবে, এক্ষেত্রে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক, কর অব্যাহতি বা ভূমি সুবিধা দিলেই প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা FDI নিশ্চিত হয় না। বরং প্রয়োজন-
নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
লজিস্টিক সাপোর্ট
দক্ষ জনশক্তি
নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং
স্থানীয় কাঁচামালের সহজলভ্যতা
এই মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত না করা গেলে মিডিয়ায় যতই আশাবাদী প্রতিবেদন প্রকাশিত হোক না কেন, পর্যাপ্ত FDI আকর্ষণ করা বিশ্বের স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিংই থেকে যাবে।
অন্যদিকে, রেমিট্যান্স আয় ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সাথে FDI-এর সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় শিল্পপতিদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং প্রবাসী আয়ের একটি অংশ FDI-সদৃশ সুবিধার মাধ্যমে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করলে ৮-১০ বিলিয়ন ডলারের (FDI) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটাই সহজ হয়ে যেতে পারে।
আশার বিষয়, বর্তমান সরকার FDI আকর্ষণে একটি বিশেষ বিনিয়োগ কার্যালয় চালু করেছে। যদিও এর পূর্ণাঙ্গ ফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে সরকারের এই উদ্যোগ ও সামগ্রিক কার্যক্রম ইতিবাচক ও গঠনমূলক বার্তা বহন করছে। আমরা নিরাশাবাদী নই-বরং বাস্তববাদী আশায় বিশ্বাসী।
তথ্যসূত্র: OECD FDI in Figures, উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশের প্রথম সারির নিউজ মিডিয়া।
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
ডিবিসি/এসএফএল