আমি সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলাম জীবনের অনিবার্য ঝুঁকি নিয়েই হয় মরব, না হয় মাথা উঁচু করে বাঁচব।’ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি স্মরণ করে নিজের অদম্য মানসিকতার কথা এভাবেই ব্যক্ত করেন নেত্রকোণার তরুণী সোমাইয়া আক্তার মিতু।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৪ আগস্ট নেত্রকোণা শহরের কুরপাড় এলাকায় একদফা দাবির কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মারাত্মক হামলার মুখে পড়েন ২৪ বছর বয়সী এই তরুণী। আত্মরক্ষার্থে দৌড়ে একটি দোকানে আশ্রয় নিতে গেলে ওপর থেকে পড়ে যাওয়া শাটারের তীব্র আঘাতে তাঁর কোমর ও মুখের চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চিকিৎসকদের মতে, কোমরের পিএলআইডি (PLID), চোয়ালের জয়েন্টের জটিলতা এবং থ্যালাসেমিয়া মাইনরজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে বর্তমানে হুইলচেয়ারেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে তাঁর স্বাভাবিক চলাফেরা। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার আর্থিক চাপ সত্ত্বেও আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্নে অবিচল রয়েছেন তিনি।
নেত্রকোণা শহরের বাসিন্দা প্রয়াত মোফাজ্জল হোসেন ও রেহেনা খানমের সন্তান সোমাইয়া আক্তার মিতু। আট বোন ও পাঁচ ভাইয়ের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা মিতু ২০১৭ সালে দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৯ সালে নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। শৈশবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও পিতৃহীন পরিবারের আর্থিক বাস্তবতায় তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
পরে ২০২১ সালে সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে সফলভাবে ‘ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি’ কোর্স সম্পন্ন করেন তিনি। মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা এই তরুণী ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদ ও ওয়াসিম আকরামের রক্তাক্ত ছবি দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। পড়াশোনা শেষ করে তিনি রাজপথের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
প্রতিবাদের এই কঠিন যাত্রায় নানা হুমকি ও ছাত্রলীগের হেনস্তার মুখে পড়লেও একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা মিতুর পাশে এসে দাঁড়ান।
মিতুর বড় বোন, কবি, লেখক ও উন্নয়নকর্মী তহুরা আক্তার বলেন, ‘মিতু শুধু আমার ছোট বোন নয়; সে আমাদের পরিবার এবং নতুন প্রজন্মের সাহস ও প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রতীক। আন্দোলন চলাকালে ওর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। নানা হুমকি-ধমকিও এসেছে। কিন্তু ওর অদম্য জেদ এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখে আমরা পিছু হটতে পারিনি। আমরা ওকে বলেছিলাম তুমি সবার মতো ন্যায্য প্রতিবাদ চালিয়ে যাও।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ হুইলচেয়ারে থমকে গেলেও ওর চিন্তার স্বাধীনতা ও স্বপ্নের জায়গায় একটুও ভাটা পড়েনি। আমরা চাই, সে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াক।’
মিতু জানান, বড় বোন তহুরা আক্তারের নিবিড় সান্নিধ্যের পাশাপাশি তহুরার স্বামী কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক স্বাধীন চৌধুরীর মুক্তচিন্তা, সততা, প্রগতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করেছে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট জেলা শহরের কুরপাড় এলাকায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে মিতুর স্বাভাবিক চলাফেরার সক্ষমতা কমতে থাকে। এ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসায় পরিবারের প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
৫ আগস্টের পর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা সুযোগসন্ধানী ও ভুয়া আন্দোলনকারীদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলায় নতুন করে সাইবার বুলিং ও হেনস্তার শিকার হন তিনি।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সাবাবা হক ও প্রাপ্তিসহ সক্রিয় নারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে চালানো অপপ্রচারের বিষয়ে স্থানীয় সেনাক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ জানান মিতু। পরে কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের ডেকে এনে তাঁর সামনে ক্ষমা চাইতে বলে এবং ভবিষ্যতে আর হেনস্তা না করার লিখিত অঙ্গীকার নেয় বলে তিনি জানান।
নিজের শারীরিক কষ্ট ও আন্দোলনে অবদানকে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ব্যবহার না করে নীরবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এবং জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ব্যক্তিস্বার্থে কাজে না লাগানোর এই দৃষ্টান্ত সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি।
বিষয়টি সিএমএইচে আহতদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সিনিয়র প্রতিনিধি নুসরাত জাহানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সিএমএইচে মিতুর উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
২০২৬ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেন মিতু। সময়সূচির কারণে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না হলেও বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে আসে। পরে তিনি মিতুকে ডেকে নিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সোমাইয়া, তোমার শরীরের কী অবস্থা এখন? তোমার কথা তো অনেক শুনলাম!’
জবাবে মিতু বলেন, ‘খানিকটা উন্নতি হলে আবার অবনতি হয়। এভাবেই চলছে সিএমএইচে চিকিৎসা। দেখা যাক, আল্লাহ ভরসা।’
তখন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধানকে বলে দিয়েছি, তোমার সব ধরনের চিকিৎসা যেন সঠিকভাবে চলে, সে ব্যবস্থা নিতে। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে হলে আমি আমার নিজের অর্থায়নে তোমাকে পাঠাব। চিন্তা করো না।’
প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসের জবাবে মিতু ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে দেশ ও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে বলেন, ‘ধন্যবাদ স্যার, লাগবে না। আপনাদের দোয়া চাই। একজন সাধারণ মানুষ এবং একজন নারী হিসেবে আমাদের নিরাপত্তা চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমরা এমন নতুন বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা দিন দিন কমতে থাকবে কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হবে। আমরা নারীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তাও চাই।’
উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, সব হবে। তোমার চিকিৎসা তো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাই এমআইএস (MIS) প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। এটা লাগবেই। আগে তুমি সুস্থ হও, এরপর আবার একসঙ্গে বসে তোমার কথা শুনব।’
সাক্ষাৎকালে আরেকটি হৃদ্যতাপূর্ণ মুহূর্তের সৃষ্টি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমান উঠে দাঁড়িয়ে মিতুর সঙ্গে আন্তরিকভাবে কুশল বিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক উদ্যোগ এবং তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর রাখার বিষয়ে মিতু বলেন, ‘যে বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আমি সেই বাংলাদেশের অপেক্ষাতেই আছি।’
সিএমএইচে চিকিৎসাধীন মিতু সুস্থ হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, চাকরি এবং পিছিয়ে পড়া নারীদের কল্যাণে কাজ করার অদম্য প্রত্যয় নিয়ে আজও পথ চেয়ে আছেন তাঁর স্বপ্নের সেই বাংলাদেশের দিকে।
ডিবিসি/ আরএফই