কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে খিলপাড়া এলাকায় প্রায় ২০ বছর ধরে পড়ে থাকা ময়লার ভাগাড়টি স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কারণ ছিল। বছরের পর বছর অভিযোগ ও মানববন্ধন করেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে রবিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে ভাগাড়ের ময়লা সরিয়ে বালুচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
শুধু খিলপাড়া নয়, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে জেলা শহরের বিভিন্ন সড়ক ও আশপাশে জমে থাকা ময়লাও অপসারণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নেওয়া অস্থায়ী উদ্যোগ যেন সফর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ না হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের এই ময়লার ভাগাড়ের স্থায়ী সমাধান করে এলাকাটিকে জনদুর্ভোগ ও পরিবেশদূষণ থেকে মুক্ত করার দাবি তাদের।
খিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, এই ময়লার ভাগাড়টি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমস্যার কারণ। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে বহুবার গিয়েছি, কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। পুরো গ্রামের মানুষ এ নিয়ে মানববন্ধনও করেছে। তাতেও কোনো সাড়া মেলেনি। অথচ প্রধানমন্ত্রী আসবেন এই খবর পাওয়ার পর পৌর কর্তৃপক্ষ ঠিকই উদ্যোগ নিয়েছে।
আরেক বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, ময়লার স্তূপ জমে প্রায়ই সড়ক পর্যন্ত চলে আসত। এতে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হতো। দুর্গন্ধের কারণে এলাকায় বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, আমরা বহুদিন পৌরসভার কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছি। তারা মাঝে মধ্যে এসে এক্সকাভেটর দিয়ে সড়কে পড়ে থাকা ময়লা সরিয়ে নিতেন। এখন প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে এক সপ্তাহ ধরে পুরোদমে বালুচাপা দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখে বোঝারই উপায় নেই এখানে ময়লার ভাগাড় ছিল। আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পরও জায়গাটি যেন এভাবেই পরিষ্কার রাখা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খিলপাড়ার ওই স্থানে কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন বাজার ও বাসাবাড়ির ময়লার পাশাপাশি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্যও ফেলা হয়। পৌরসভা ছাড়াও কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুর উপজেলার কিছু এলাকার ময়লাও এখানে এনে ফেলা হতো। উন্মুক্তভাবে বর্জ্য পড়ে থাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের সৃষ্টি হয়।
কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ভৈরবগামী হাজারো যানবাহন ও পথচারী চলাচল করেন। বৃষ্টির সময় ময়লা পচে সড়কে চলে আসায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, তিন-চার বছর আগে এখানে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও লোকবল সংকটসহ নানা কারণে সেটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
শনিবার বিকেলে খিলপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে আগের সেই বিশাল ময়লার স্তূপ আর নেই। কিছু ময়লা সরিয়ে তার ওপর বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ফলে জায়গাটি আপাতত পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। আগে দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক চেপে চলাচল করলেও এখন স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করতে পারছেন।
একই মহাসড়কের কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও ময়লার স্তূপ ছিল। সেখানেও বালুচাপা দিয়ে ময়লা ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে মূলত সাময়িকভাবে এসব ময়লা ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। সফর শেষ হলে আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নয়, শহর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সামগ্রিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক জেবুন নাহার শাম্মী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে যত্রতত্র ময়লা না ফেলে সার্বিকভাবে শহর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য শহরে মাইকিং করে জনসাধারণকে সচেতন করা হচ্ছে, যাতে কেউ আগামী কয়েক দিন রাস্তায় বা উন্মুক্ত স্থানে ময়লা না ফেলেন।
তিনি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার জায়গাটি আপাতত অস্থায়ীভাবে বালুচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। এখানে স্থায়ীভাবে বর্জ্য নিরসনের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কয়েক দিন পর হয়তো সেটি চালু করা যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জ্বল হোসেনের সই করা সফরসূচি অনুযায়ী, রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়িঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা রয়েছে তার।
এরপর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কটিয়াদীর কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করবেন তিনি। বেলা ১টার দিকে আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
বেলা আড়াইটার দিকে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং জেলা ছাত্রদল আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সার্কিট হাউসে মধ্যাহ্নভোজ ও বিশ্রাম শেষে বিকেল ৪টার দিকে জেলা শহরের পুরোনো স্টেডিয়াম মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন অনুদান এবং মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে সড়কপথে কিশোরগঞ্জ ছাড়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। রাত ৮টার দিকে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ডিবিসি/এসডব্লিউএন