এত এত অর্জন আর রেকর্ডের পরও তাঁর এই কান্না যেন বড্ড বেমানান! সর্বকালের সেরা ফুটবলারের চোখে কি এমন শূন্যতার জল মানায়?
দশ বছর আগের সেই বিষাদময় রাতের স্মৃতি যেন অদ্ভুতভাবে আরও একবার ফিরে এল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ২০১৬ সালের সেই হতাশাগ্রস্ত লিওনেল মেসি আর ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজিত মেসি, মাঠ এক, হাঁটু গেড়ে বসার ভঙ্গিও এক, কেবল বদলে গেছে সময়ের প্রেক্ষাপট। সেদিনও তিনি মাঠের এক কোণে মাথা নিচু করে কেঁদেছিলেন, আজও তাঁর চোখে জল। দৃষ্টি কখনো অবিচল সবুজ ঘাসের দিকে, কখনোবা আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে আছেন সেই ফসকে যাওয়া বিশ্বকাপের রুপালি ট্রফিটার দিকে। মনে হচ্ছে, বুয়েনস আইরেসের সেই জাদুকরের হৃদয়ে আবারো আছড়ে পড়ছে রিও দে লা প্লাতার বিষণ্ণ ঢেউ।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দলটি কাগজে-কলমে খুব একটা ফেভারিট ছিল না। তরুণ আর অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া কিছুটা ভারসাম্যহীন এক স্কোয়াডের একমাত্র ভরসাকেন্দ্র ছিলেন সেই মেসি। চোটের কারণে তাঁর খেলা নিয়েই যেখানে ধোঁয়াশা ছিল, সেখানে তিনি রীতিমতো অবিশ্বাস্য এক জাদুর প্রদর্শনী মেলে ধরলেন। নিজের পড়ন্ত বেলায় আট ম্যাচে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন তিনি। শুধু কি তাই? টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা, সর্বোচ্চ ৩৪টি ম্যাচ, ২১টি গোল আর ১২টি অ্যাসিস্ট, বিশ্বকাপের ইতিহাস বইয়ের প্রতিটি পাতায় তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অবিসংবাদিত চূড়ায়।
২০১৬ সালের ২৬ জুনের কথা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে, পেনাল্টি মিসের যন্ত্রণায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন তিনি। অভিমানী সেই অবসরের পর ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো তাঁর উত্থান দেখেছিল বিশ্ব। ফিরে এসে আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন ৩৬ বছরের আরাধ্য বিশ্বকাপ, জোড়া কোপা আমেরিকা আর ফিনালিসিমার শিরোপা। ক্যারিয়ারের কোনো অপূর্ণতাই তিনি বাকি রাখেননি, আন্তর্জাতিক ট্রফির খরা মিটিয়ে নিজেকে করেছেন অনবদ্য এক কিংবদন্তি।
১০ বছর পর একই স্টেডিয়ামে তাঁর এই অশ্রুসিক্ত বিদায় হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর জাদুকরী অধ্যায়ের সমাপ্তি রেখা। কিন্তু আক্ষেপ করার মতো তাঁর তো আর কিছুই নেই! ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যালন ডি'অর থেকে শুরু করে ফুটবলের সম্ভাব্য সব শিরোপাই তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে। এবারের বিশ্বকাপে তাঁর নেতৃত্বেই একটি নড়বড়ে দল বিশ্বকে প্রমাণ করে দেখিয়েছে, মাঠে ১১ জন মহাতারকার চেয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা ১১ জন যোদ্ধার ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী। কোচ স্কালোনির দলকে তিনি যে সুতোয় বেঁধেছেন, তা সহজে ছিন্ন হওয়ার নয়।
মেসি, তোমার আর কান্নার কিছু নেই। তুমি যে মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছো, সেই আলোতেই এখন পথ চলবে আগামীর আর্জেন্টিনা। হুলিয়ান আলভারেজ, নিকো পাজ, জুলিয়ানো সিমিওনে কিংবা ভ্যালেন্টিন বার্কোরা তোমার দেখানো অদম্য সাহসেই নিজেদের শাণিত করবে। হয়তো ২০৩০ সালের ২৪তম বিশ্বকাপে ইউরোপের কোনো এক মঞ্চে এই তরুণেরাই মুছে দেবে তোমার মেটলাইফের বিষাদের দাগ।
ডিবিসি/এফএইচআর