প্রেমের টানে দেশ ছেড়ে বিদেশে কিংবা প্রেমের টানে ধর্মান্তরিত হওয়ার খবর হরহামেশাই শোনা যায়। তবে, প্রেমের টানে বাংলাদেশে এসে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন এমন ঘটনা বিরল। এবার ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ঘটল এমনই ঘটনা। ফিলিপাইনের মেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন জনপ্রতিনিধি।
সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত (১, ২ ও ৩ নম্বর) ওয়ার্ড থেকে মাইক প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা। ময়মনসিংহের যুবককে বিয়ের পর জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা থেকে নাম বদলে হয়ে যান জেসমিন আক্তার।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জেসমিন পেয়েছেন চার হাজার ৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বক প্রতীক নিয়ে শিমু আক্তার পান এক হাজার ৮৩৭ ভোট।
২০১০ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ের পর খ্রীস্টান ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হওয়ার পর স্বামীর নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখেন জেসমিন আক্তার জুলহাস। স্বামীর নাম জুলহাস উদ্দিন মন্ডল। সে ঐ ইউনিয়নের দবরদস্তা গ্রামের আব্দুস সামাদ মন্ডলের ছেলে। জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা পড়াশোনা করেছেন ফিলিপাইনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ বিভাগে। গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্নের পর চলে যান সিঙ্গাপুরে। সেখানে চাকরির সুবাদে পরিচয় হয় বাংলাদেশি তরুণ জুলহাস উদ্দিন মন্ডলের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম, এরপর বিয়ে।
নির্বাচনী প্রচারণায় জেসমিন গ্রামের রাস্তায় বের হলেই উৎসুক মানুষ তাকে দেখতে ভিড় করছেন। ঠিকমতো বাংলা বলতে পারে না জেসমিন। তার মুখে ভাংগা ভাংগা বাংলা ও ইংরেজি কথা শুনে অনেকেই আনন্দ প্রকাশ করেন। বেশির ভাগ সময় ইংরেজীতে কথা বলেন জেসমিন। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে স্বামী জুলহাস দোভাষী হিসেবে ইংরেজি কথা বাংলায় আর বাংলা কথা ইংরেজীতে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেন জেসমিন আক্তারকে।
জুলহাসের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানিতে চাকরি করার সময় সহকর্মী জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সিঙ্গাপুরে দশ বছর চাকরী শেষে জুলহাস বাংলাদেশ চলে আসেন। জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকাও তার দেশ ফিলিপাইনে চলে যান। কিন্তু দু’জন দুই দেশে চলে গেলেও দুজনের ফোনে যোগাযোগ ছিল। ২০১০ সালে জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা প্রেমের টানে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। পরে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা। নতুন নাম হয় জেসমিন আক্তার জুলহাস। বাংলাদেশে আসার পর তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান। সংসার জীবনে তাদের ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
জুলহাস আরো জানান, জেসমিন মানুষকে নানাভাবে উপকার করার চেষ্টা করেন। তার ভেতর নেতৃত্বের গুণ রয়েছে। তাই এলাকাবাসীর অনুরোধে সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন জেসমিন।
জেসমিন আক্তার জুলহাস বলেন, স্বামী জুলহাসের জন্য নিজের দেশ ও বাবা-মাকে ছেড়ে বাংলাদেশ চলে আসি। এ দেশের মানুষ অনেক ভালো। কিন্তু এখানের রাস্তা খুব খারাপ। এলাকার মানুষ আমাকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেছে এতে আমি খুব আনন্দিত। তাদের সেবা করার সুযোগ পাব তা ভাবতেই পারি নাই। এলাকার অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।
দবরদস্তা গ্রামের একাধিক বাসিন্ধা বলেন, জেসমিন একজন ভালো মনের মানুষ। মানুষের দুঃখ দেখলে সে এগিয়ে আসে। প্রথম দিকে তাদের পরিবার নির্বাচন করতে রাজি ছিলনা। পরে এলাকাবাসীর চাপে সে ভোটে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। আমরা একজন শিক্ষিত মেয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পেরে খুবই আনন্দিত।