আন্তর্জাতিক

ফের যুদ্ধ লাগলে ‘মহাবিপর্যয়’ ঘটানোর হুমকি ইরানের!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

২ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তি যখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে , এবার যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয় তবে তার রূপ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৃহস্পতিবার (২৯ মে) মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি খসড়া চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা এখন কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এই কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও সামরিক উত্তেজনা কমেনি; চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়েছে এবং হরমোজ প্রণালিতেও দুই পক্ষের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

এই আলোচনার আবহেই ইরান নিজেদের সামরিক আত্মবিশ্বাস প্রদর্শন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা এমন সব জায়গায় ‘বিধ্বংসী আঘাত’ ও ‘মহাবিপর্যয়’ ডেকে আনবে, যা শত্রুরা কল্পনাও করতে পারবে না। ইতিপূর্বে ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরান যেভাবে মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েলের শহর এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছিল, এবার তার চেয়েও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য মূলত সম্ভাব্য মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা ঠেকানোর একটি কৌশল। তবে কূটনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়লে তেহরানের হাতে বিশ্বকে বিপদে ফেলার মতো বেশ কিছু কার্যকর সামরিক বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি নতুন নৌ অবরোধ। প্রথাগত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ না হওয়ায় ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার কৌশল বেছে নিয়েছে। ইতিপূর্বে হরমোজ প্রণালি সফলভাবে বন্ধ করার পর, এবার তারা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সক্রিয় করে লোহিত সাগরের ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি পুরোপুরি অচল করে দেওয়ার ছক কষছে, যা ইউরোপ, এশিয়া ও আরব বিশ্বের বাণিজ্যের মূল ধমনী। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক সমুদ্রবাহিত তেল বাণিজ্যের ১০ শতাংশেরও বেশি এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হতো, যা ২০২৪ সালে হুথিদের আক্রমণের কারণে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমোজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একসাথে সংকট তৈরি হলে তা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও পণ্য পরিবহন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। যদিও হুথিদের ওপর ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই পথ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন, তবে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বানিয়ে ফেলা তেহরানের জন্য অসম্ভব নয়।

 

পাশাপাশি, ট্রাম্প যদি ইরানের তেল শোধনাগার বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে ইরান এই যুদ্ধকে পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য আহমদ বখশায়শ আরদেস্তানি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের তেল অবকাঠামোতে হাত দিলে ইরান সরাসরি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেলের কূয়াগুলোতে আঘাত হানবে, যেন বিশ্বজুড়ে জ্বালানির তীব্র সংকট তৈরি হয়। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইরাকে সক্রিয় ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো আবুধাবির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সৌদি আরবে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। গত যুদ্ধে ইরান হোটেল বা বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র মারলেও পানি শোধনাগারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কিংবা মার্কিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এড়িয়ে গিয়েছিল, যা এবার তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরান এবার তাদের হামলার পরিধি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত করার হুমকি দিচ্ছে। সম্প্রতি বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম পেজগুলোতে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের মার্কিন বিমান ঘাঁটির স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। গত মার্চ মাসে ইরান তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে ২০০০ মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ‘ডিয়েগো গার্সিয়া’ লক্ষ্য করে দুটি মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফার্জিন নাদিমি মনে করেন, ইরান চরম উত্তেজনার মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ও ল্যাকেনহিথ বিমান ঘাঁটি কিংবা জার্মানির রামস্টেইন লজিস্টিক হাবের মতো ইউরোপীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সারপ্রাইজ অ্যাটাক চালাতে পারে, এমনকি সাইপ্রাসের ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাও এই সীমানার মধ্যে পড়তে পারে।

 

এই সম্ভাব্য যুদ্ধ জয়ী হতে ইরান এবার আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। রাডার ফাঁকি দেওয়া, জ্যামিং প্রতিরোধ করা এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রেখে পথ পরিবর্তন করতে সক্ষম এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত ড্রোনের ঝাঁক একসাথে মোতায়েন করতে পারে তেহরান। এছাড়া তারা তাদের বর্তমান ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে সুপারসনিক গতিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে এবং সামরিক যোগাযোগ ও নজরদারি স্যাটেলাইটগুলোর কার্যকারিতা জ্যামিংয়ের মাধ্যমে পঙ্গু করে দেওয়ার প্রযুক্তিও নিয়ে আসছে। যদিও প্যারিসের সায়েন্সেস পো-এর সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি মনে করেন ইরানের অস্ত্রগুলো বিশ্ববাসীর চেনা এবং এর সর্বোচ্চ পাল্লা ২০০০ কিলোমিটারের আশেপাশে, তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ইরানকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; তারা একই সাথে ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ ও বেইজিংয়ের সাথে ভারসাম্য রেখে চলার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে এই চক্র থেকে বের হতে হলে দুই দেশের মধ্যে অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং মূল বিরোধগুলোর সমাধান করা জরুরি।

 

সূত্র: সিএনএন

 

ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন