জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও ভয়ংকর রূপের মুখোমুখি এখন ইউরোপ। উত্তর আফ্রিকা থেকে ধেয়ে আসা তীব্র গরমের হল্কা এবং আবহাওয়াবিদদের ভাষায় এক শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ বা তাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্সে শুরু হয়েছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপদাহ। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবনের মাঝেই এ পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা বা ‘রেড অ্যালার্ট’।
এবার তাপদাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং রাজধানী প্যারিসে। মেতেও-ফ্রান্স(Météo-France)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বড় বড় শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিম (Nîmes) শহরে, যেখানে তাপমাত্রা রেকর্ড ৪৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এছাড়া দক্ষিণের অন্যতম প্রধান শহর মার্সেই (Marseille)-তে ৪১.৫ ডিগ্রি, মধ্যাঞ্চলের লিঁও (Lyon)-তে ৪১ ডিগ্রি, এবং রাজধানী প্যারিস (Paris)-এ ৩৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। শুধু দিনের বেলাই নয়, রাতের তাপমাত্রাও ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামছে না, যা ফরাসি ইতিহাসে বিরল। অতিরিক্ত গরমে রেললাইন গলে যাওয়ার বা বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকিতে ট্রেন চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত করা হয়েছে। এ ছাড়া এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও রেকর্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার থেকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করতে পারে এবং সপ্তাহের শেষ নাগাদ বজ্রঝড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্যারিসসহ দেশের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে এই তীব্র গরম আগামী সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত বজায় থাকার শঙ্কা রয়েছে।
চলতি তাপদাহে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া ৪৫টি মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটেছে সাঁতার কাটতে গিয়ে। তীব্র গরম থেকে বাঁচতে লাইফগার্ডবিহীন নদী, খাল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে নেমে গত কয়েকদিনে ডুবে মারা গেছেন অন্তত ৪০ জন, যার মধ্যে প্যারিসের স্যান নদীতে ৩ জন, লিঁও-র রোন নদীতে ৪ জন এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন লেকে বাকিরা প্রাণ হারিয়েছেন; যাদের একটি বড় অংশই তরুণ। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিম শহরের একটি পার্ক করা গাড়ির ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে মার্সেই এবং লিঁও শহরে হিট স্ট্রোক ও গরমজনিত কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩ জন প্রবীণ নাগরিক।
ফরাসি প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার জন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া হলেও, জীবিকার তাগিদে এই চরম বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই মাঠে থাকতে হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের। বিশেষ করে ফ্রান্সের কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ খাত, রেস্তোরাঁর গরম রান্নাঘর এবং তীব্র রোদের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে ফুড ডেলিভারির মতো কঠোর পরিশ্রমের সেক্টরগুলোতে হাজারো বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। বহুতল ভবনের ছাদে বা খোলা আকাশের নিচে সরাসরি রোদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে প্রবাসীদের অনেকেই ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা এবং হিট স্ট্রোকের মতো চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন। এ ছাড়া রেস্তোরাঁর ভেতরের তাপমাত্রা চুল্লির তাপে প্রায় ৫০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই হওয়ায় রান্নাঘরের কর্মীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। স্থানীয় বিভিন্ন বাংলাদেশি সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্বদের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের কাজের ফাঁকে প্রচুর পানি ও স্যালাইন পান করার এবং শরীর অতিরিক্ত খারাপ হলে ফরাসি জরুরি সেবা নম্বর 15-তে অবিলম্বে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন শহরের পাবলিক পার্ক, সুইমিং পুল এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘শীতল কেন্দ্র’ বা কুলিং জোনগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না বের হতে এবং একে অপরের খোঁজ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জলবায়ুর এই চরম রূপ ফরাসি প্রশাসন ও নগর পরিকল্পনাবিদদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে যে, ভবিষ্যতের তীব্র গ্রীষ্মকালগুলো মোকাবিলা করতে তারা অবকাঠামোগতভাবে কতটা প্রস্তুত।
ডিবিসি/এফএইচআর