বাংলাদেশ, জেলার সংবাদ

বরগুনায় রুহের মাগফিরাতের ১৮ বছর পর জীবিত ফিরলেন আলমগীর!

বরগুনা প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

৮ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

মৃত্যুর খবরে যার রুহের মাগফিরাত কামনা করে মসজিদে দোয়া হয়েছিল, দীর্ঘ ১৮ বছর পর সেই ব্যক্তিই জীবিত ফিরে এলেন নিজ গ্রামে। তবে ফিরে এসে দেখলেন, যে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি একদিন গ্রাম ছেড়েছিলেন, সেই পরিবারের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বৃদ্ধ মা-বাবা শুয়ে আছেন কবরে, স্ত্রী বেঁধেছেন নতুন সংসার, আর আদরের ছোট্ট মেয়েটি এখন অন্যের ঘরের বধূ। এমন এক মর্মান্তিক ও অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ছোট টেংরা গ্রামে। ফিরে আসা এই হতভাগ্য মানুষের নাম আলমগীর হোসেন হাওলাদার।

পরিবারের সচ্ছলতা ও ছোট মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ২০০৮ সালে গ্রামের ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন আলমগীর। কিন্তু ঢাকায় যাওয়ার কিছুদিন পরই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একসময় স্বজনরা ধরে নেন তিনি আর বেঁচে নেই। গ্রামের মসজিদে তার মৃত্যুর খবর (জোমাত) জানিয়ে রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। অভাবের তাড়নায় ও বাস্তবতার কঠিন নিয়মে স্ত্রী অন্যত্র সংসার বাঁধেন। অবুঝ কন্যাসন্তানটিও বড় হয়ে একসময় অন্যের ঘরে চলে যায়। আর সন্তান হারানোর শোকে কাঁদতে কাঁদতে একসময় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তার বৃদ্ধ মা-বাবা।

 

গ্রামবাসীর কাছে আলমগীর যখন কেবলই এক স্মৃতি, তখন বাস্তবে কোনো এক অসাধু চক্রের গোপন বন্দিশালায় নরকযন্ত্রণা ভোগ করছিলেন তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সূর্যের আলো দেখেননি তিনি। বিনা পারিশ্রমিকে জবরদস্তিমূলক কায়িক শ্রম ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে। তার জীবনের সোনালি যৌবনের সব আলো শুষে নেয় ওই অদৃশ্য খাঁচা।

 

দীর্ঘ বন্দিদশার পর সম্প্রতি ওই চক্রটি আলমগীরসহ প্রায় ৩০ জন বন্দিকে নির্জন এক রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। হঠাৎ এমন অদ্ভুত মুক্তিতে অসহায় আলমগীর বুঝে উঠতে পারছিলেন না কোথায় যাবেন। অবশেষে নিজের সামান্য শ্রমের জমানো টাকা সম্বল করে দীর্ঘ ১৮ বছর পর পা বাড়ান নিজ ভিটেমাটির দিকে।

 

বাড়িতে পৌঁছাতেই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দীর্ঘদিনের অনাহার আর অত্যাচারে আলমগীরের চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে, প্রথম দেখায় নিজের ভাইও তাকে চিনতে পারেননি। পরে পরিচয় দিলে দুই ভাই বুকে বুক মিলিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিন্তু এই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণিকের। শূন্য ভিটেতে দাঁড়িয়ে যখন তিনি জানতে পারেন তার মা-বাবা আর বেঁচে নেই এবং স্ত্রী-সন্তানও আর তার সংসারে নেই, তখন মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন আলমগীর।

 

আলমগীরের এই বুকফাটা কান্নার খবরে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এই কঠিন মানবিক বিপর্যয়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় মানবিক ব্যক্তিত্ব বদিউজ্জামান সাহেদ। তিনি আলমগীরের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে আর্থিক ও মানসিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছেন।

 

তবে আলমগীরের এই প্রত্যাবর্তন সমাজে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে। স্থানীয় জনগণ ও মানবাধিকার কর্মীদের এখন একটাই দাবি যে নির্মম অপরাধী চক্রটি একজন মানুষের জীবনের ১৮টি বছর কেড়ে নিয়েছে, তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দেশে এমন আরও কত আলমগীর অজ্ঞাত বন্দিশালায় ধুঁকছেন, তা খুঁজে বের করে এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন চরদুয়ানীর মানুষ।

 

ডিবিসি/এমএনকে

আরও পড়ুন