জাতীয়, অপরাধ

ভিসা কার্ড হ্যাক, ৯টি দেশে কেনাকাটা, পুলিশের হাতে ধরা

ময়ূখ

ডিবিসি নিউজ

বুধবার ২রা সেপ্টেম্বর ২০২০ ০১:৪৭:৩৯ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

পাপুয়া নিউগিনির বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক নাগরিক আব্দুল ওয়াহেদের ভিসা কার্ড হ্যাক হয় ২০১৪ সালে। সেই কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার কেনাকাটা করে হ্যাকার। তবে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা হয়নি হ্যাকারের।

ভুক্তভোগী ওয়াহেদ বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোতে আইনি সহায়তা চেয়ে ব্যর্থ হন। শেষ ভরসা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে চান আইনি সহায়তা। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ খুঁজে পায় সেই হ্যাকারকে। বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। 

পাপুয়া নিউগিনির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের একজন দেশ বেশ এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আব্দুল ওয়াহেদ। ২০১৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে ব্যবসায়িক কাজে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। 

কাজ শেষে সিঙ্গাপুরের পার্করয়েল হোটেলের বিল পরিশোধ করতে গেলে বলা হয় তার ইন্টারন্যাশন্যাল ভিসা কার্ডটি রেস্ট্রিকটেড করা হয়েছে। 

নিজের কাছে থাকা নগদ টাকা ও পরিচিতজনের সহায়তায় বিল পরিশোধ করে পাপুয়া নিউগিনি ফিরে যান তিনি। যোগাযোগ করেন ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেড কর্তৃপক্ষের সাথে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায় প্রতারণামূলক বৈদেশিক লেনদেন সন্দেহে তার কার্ডটি রেস্ট্রিকটেড করা হয়েছে। 

ব্যাংক জানায় ২০১৪ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আব্দুল ওয়াহেদের ভিসা কার্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটা ও ভার্চুয়াল কার্ড কিনে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। 

ব্যাংকের এই বক্তব্য দায়সারা মনে হলে ক্ষতিপূরণ দাবি করে ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পাল্টা মামলা করে আব্দুল ওয়াহেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ কার্ডের তথ্য পাচার করে ওয়াহেদ নিজে অথবা তার কর্মচারি কিংবা আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে টাকাগুলো খরচ করেছেন।

ক্ষতিপূরণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে আইনি লড়াই শুরু করেন তিনি। যেসব দেশে তার কার্ড দিয়ে লেনদেন হয়েছে আইনজীবীর মাধ্যমে সেসব দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চান। কিন্তু ব্যর্থ হন তিনি। 

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসেন ওয়াহেদ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। 

বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত পাপুয়া নিউগিনি'র নাগরিক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, "ব্যাংকের লেনদেনের দায় আমার ওপর চাপায়। ক্ষতিপূরণ চেয়ে আমি পাপুয়া নিউগিনির ন্যাশনাল কোর্টে মামলা করি। আইনজীবীর মাধ্যমে ২০১৪ থেকে ২০১৯, পাঁচ বছরে এ দেশ ও দেশ ঘুরে কোনো পজেটিভ রেজাল্ট না পেয়ে শেষ চেষ্টা হিসেবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে গিয়ে মামলা করি। বাংলাদেশের পুলিশের সদস্যরা ইন্টারন্যাশনালি সক্রিয়, তারা এই হ্যাকারকে খুঁজে বের করে।"   

দীর্ঘ ৮ মাসের অনুসন্ধান শেষে পুলিশ খোঁজ পায় নাজমুস সাকেব নাঈম নামের এক আইটি বিশেষজ্ঞের।  যিনি আবদুল ওয়াহেদের ভিসা কার্ডটি হ্যাক করে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড থেকে ২০১৪ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৮০ দিনে মোট ১ হাজার ৪৭৬টি লেনেদেনের মাধ্যমে সাড়ে তিন কোটি টাকা খরচ করেন।

ওই কার্ড ব্যবহার করে অনলাইনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ৯টি দেশ থেকে দামি সফটওয়্যার, ম্যাকবুক, আইফোন কেনেন সাকেব। পাশাপাশি নিজের "ENTROPAY" একাউন্ট ব্যবহার করে ভার্চুয়াল ভিসা কার্ড জেনারেট করে ৬৯ বারে প্রায় ৯৯ হাজার মার্কিন ডলার তুলে নেন। আর "NETELLERUK" একাউন্ট ব্যবহার করে আরেকটি ভার্চুয়াল ভিসা কার্ড জেনারেট করে আরো কয়েক হাজার ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন।  এছাড়া, সাকেব ওই কার্ড ব্যবহার করে থাই এয়ারওয়েজে পরিবার নিয়ে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। 



পুলিশ বলছে, সাকেব একজন আইটি বিশেষজ্ঞ।  আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়েছেন কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন সিভিল ব্যাংক নেপালের পরামর্শক হিসেবে। তার উদ্ভাবিত দিজেডবয় নিয়ে মার্কিন সাময়িকী অন্ট্রপ্রেনার ও ফোবর্সে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

ডিএমপি'র  উপ-পুলিশ কমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ)  হারুন অর রশীদ জানান, হ্যাকারের বিদেশ ভ্রমণ লেনদেনের সূত্র ধরে তাকে ধরার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ রাত দিন পরিশ্রম করে তাকে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নেয়ার পর সে সব স্বীকার করেছে। 

সাকেবের তৈরি "PEKHOM" অনলাইনে হোটেল বুকিংয়ের জন্য বিকাশ, ওয়ানব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ। পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার ইজিপেওয়ে-র প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

পুলিশ বলছে এরকম আর কোনো অনলাইন প্রতারণায় তিনি জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

আরও পড়ুন