বাংলাদেশে বসন্তের আগমন ঘটেছিল গত ১৪ ফেব্রুয়ারি-পহেলা ফাল্গুনে। তার ঠিক দুদিন আগেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। তবে এই বিজয়ের পাশে একটি তারকা চিহ্ন (শর্ত) রয়ে গেছে: ২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিপ্লবে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন, যেখানে তার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনীতিতে ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রধান শক্তি হিসেবে পুনরুত্থানের বার্তাও দিয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তির কারণে পরিচিত এই দলটি ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিম বাংলাদেশে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে-যে অঞ্চলটি দীর্ঘকাল শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে অবহেলিত ছিল।
সংসদীয় ক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় বিএনপি সরকার শুরুতে হয়তো অনায়াসেই নতুন নতুন আইন পাস করতে পারবে। কিন্তু অর্থনীতি সামলাতে গিয়ে হোঁচট খেলে তারা একদিকে উদীয়মান জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যদিকে সুপ্ত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের চাপের মুখে পড়বে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চাকরি এবং দুর্নীতি নিয়ে যে ক্ষোভ, তা সহজে দূর হওয়ার নয়। গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া তারেক রহমানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, তবে তার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বর্তমানের ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমানের ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন কাজ। দলটি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই বিপুল ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর কোনো নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা এখনও দৃশ্যমান নয়। প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণ করতে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
গত দেড় বছর ধরে উচ্চ সুদের হার অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেকেই মনে করেন, কেবল মুদ্রানীতি নয়, বরং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাই খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ। এটিই রহমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা 'একিলিস হিল'।
দেশের অর্থনীতির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং মোট শ্রমশক্তির ৪৪ শতাংশ (প্রায় ৫ কোটি মানুষ) এই খাতে নিয়োজিত। শহরের খাদ্যমূল্য কমাতে এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীকে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং ফসল তোলার পরবর্তী লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ করতে হবে।
বিদেশে কর্মরত ১ কোটি বাংলাদেশি শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স বর্তমানে আইএমএফ-এর ঋণের চেয়েও বড় লাইফলাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রবাসীরা হুন্ডি পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানো শুরু করেন। ফলে ২০২৫ সালে রেমিট্যান্স ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই ৯ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি আয় আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের চেয়েও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই প্রবাহ ধরে রাখতে কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে।
প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যান। এটি দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের চাপের মুখে একটি 'সেফটি ভালভ' হিসেবে কাজ করে। তবে এই খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও শোষণ বিদ্যমান। ইতোমধ্যে বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশিদের জন্য বাজার বন্ধ করে দেওয়ায় দেশটি বর্তমানে প্রধানত সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ পরামর্শ দিয়েছেন যে, বিএনপির উচিত বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর হয় এমন ছোট ছোট প্রকল্পের দিকে নজর দেওয়া। এছাড়া শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নড়বড়ে আর্থিক খাত সংস্কার করা জরুরি। এর মধ্যেই ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের, যার ফলে অনেক বাণিজ্যিক সুবিধা ও শুল্ক ছাড় হারাবে দেশ।
অর্থনৈতিক পুনরুত্থান অনেকটা ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তারেক রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন, যা তার পিতা জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন। তবে সার্ক বর্তমানে একটি স্থবির সংস্থা। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত থাকায় আসিয়ান -এ যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ ও সরবরাহ চেইনের দুয়ার খুলে দিতে পারে।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সীমান্ত থাকলেও ২০২৪ সালের পর সম্পর্ক কিছুটা তিক্ত হয়েছে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় এবং তাকে হস্তান্তরের দাবিতে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা বাড়াতে হবে।
তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী। সম্প্রতি দুই দেশ বাংলাদেশে ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনে একমত হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার এবং জ্বালানি খাতে প্রধান বিনিয়োগকারী। নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিশ্চেনসেন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চায় নতুন সরকার যেন ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করে এবং চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সম্পৃক্ততার ঝুঁকিগুলো বুঝে কাজ করে।
বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণির ঝোঁক পশ্চিমাদের দিকে হলেও তারা জানে যে অবকাঠামো উন্নয়নে এশীয় শক্তিগুলোই (চীন ও জাপান) প্রধান ভূমিকা রাখছে। চীনারা বর্তমানে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য অপেক্ষা করছে। যদি রহমান ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট সংকেত দেন, তবে মার্কিন ব্যবসাগুলোকে দ্রুত এগোতে হবে। অন্যথায় তিনি বিনিয়োগের জন্য বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হতে পারেন।
চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, তবে তারেক রহমানের সামনে এখন সুযোগ এসেছে অর্থনীতিকে চাঙা করে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার।
ডিবিসি/এসএফএল