বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম নিয়ে উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এর ডাক আর তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দীপনা মিলিয়ে মিশিয়ে দেশের প্রযুক্তিখাত এক নতুন জাগরণ দেখেছে। মোবাইল ফিনটেক প্রতিষ্ঠান বিকাশের ইউনিকর্ন খেতাব পাওয়া – ২০২১ সালে সফটব্যাংক কর্তৃক ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ভ্যালুয়েশন – এই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠে। শপআপের মতো স্টার্টআপ বিপুল বিদেশি ফান্ডিং পেয়েছে, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কাড়ছে। সরকারের উদ্যোগেও ছিল নানা উদ্যম; আইসিটি বিভাগের অধীনে “স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড” প্রতিষ্ঠা করে ২০২১ সালে “শতবর্ষে শত আশা” ক্যাম্পেইনে ৫০টি স্টার্টআপে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। তরুণ জনসংখ্যা, বাড়তে থাকা ইন্টারনেট পেনিট্রেশন এবং কোভিড–পরবর্তী ডিজিটালাইজেশনের জোয়ারে দেশে এক স্টার্টআপ বিপ্লবের স্বপ্ন দানা বাঁধে। কিন্তু উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশার আড়ালে বাস্তব পরিস্থিতি কতটা মিলে, সেই প্রশ্ন এখন তীব্র হয়ে উঠেছে।
হাইপ বনাম বাস্তবতা: ইকোসিস্টেমের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আজ এক দ্বিমুখী চিত্র উপস্থাপন করছে – একদিকে সম্ভাবনার বহর, অন্যদিকে কঠিন পরিসংখ্যানের বাস্তবতা। ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত দেশের স্টার্টআপগুলো মোট প্রায় ৯৮৯ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, কিন্তু তার ৯২% অর্থই এসেছে বিদেশি উৎস থেকে, যা স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিশেষভাবে ২০২১ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক। সে বছর বিকাশ-সফটব্যাংক চুক্তিসহ রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি পুঁজি আসায় ২০২১ এবং ২০২২ সালের প্রথমার্ধে মিলিয়ে মোট ৫০৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়। বিকাশ দেশের প্রথম ইউনিকর্ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, শপআপ প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলারের সিরিজ বি ফান্ডিং সংগ্রহ করে এবং পাঠাও, চালডালসহ বেশ কিছু কোম্পানি উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ পায়। কিন্তু বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংকটের প্রভাবে ২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে চিত্র দ্রুত বদলে যায়। পুরো ২০২২ সালে বিনিয়োগ নেমে আসে ১২৫ মিলিয়ন ডলারে, আর ২০২৩ সালে তা আরও কমে ৭২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২% কম। ২০২৪ সালে পতন আরও গভীর হয়; মাত্র প্রায় ৪১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পতন দেখা গেছে স্থানীয় বিনিয়োগে। ২০২৩ সালে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের তহবিল ছিল প্রায় ১৯ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১.১ মিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৯৫% হ্রাস। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়: দেশীয় উৎস থেকে তোলা পুঁজি মাত্র ৬.২৫ লাখ ডলার। এসব পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করছে যে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখনো মূলত বিদেশি অর্থের লাইফ সাপোর্টের ওপর নির্ভরশীল, স্থানীয় পুঁজির ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।
এ প্রসঙ্গে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড–এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জনাব নুরুল হাই বলেনঃ “স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের প্রবৃদ্ধির জন্য ইনক্লুসিভ নীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টার্টআপদের Access to Capital-এ সাপোর্টের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য Repatriation প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন। তাই আমরা বর্তমানে National Startup Policy নিয়ে ফাউন্ডার, বিনিয়োগকারী ও পুরো ইকোসিস্টেমকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই; নীতি যেন কাগজে নয়, উদ্যোক্তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় বাস্তব পরিবর্তন আনে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে।”
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক বৈষম্যও স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরেই ফিনটেক ও ডিজিটাল ফাইন্যান্স সর্বাধিক বিনিয়োগ–আকর্ষক খাত। এমনকি বৈশ্বিক মন্দাবাজারের মধ্যে ২০২৩ সালেও বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ এসেছে গার্মেন্টস/টেক্সটাইল (উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন উদ্ভাবন), এরপর এডুটেক ও হেল্থটেক খাতে। একই বছরে আর্থিক সেবা, পোশাক–টেক্সটাইল ও শিক্ষা খাত মিলিয়ে ১৪টি ডিলে ৪৯ মিলিয়ন ডলার তোলা হয়, যার মধ্যে ফিনটেক সেক্টর একাই ৬টি চুক্তিতে ৩২ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে।
উল্লেখযোগ্য ফান্ডিং উদাহরণের মধ্যে রয়েছে শপআপ, ১০ মিনিট স্কুল, আরোগ্য ও যাত্রী। এই চারটি স্টার্টআপ মিলে ২০২৩ সালে ৫৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। একই বছরে শেবা প্ল্যাটফর্ম দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী BSRM থেকে ২২.২ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পায়, যা কর্পোরেট সেক্টরের পক্ষ থেকে স্টার্টআপে বড় বিনিয়োগের একটি মাইলফলক।
এসব চিত্র প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো নিজস্ব কৌশল, পণ্য উদ্ভাবন ও খাতভিত্তিক বিশেষায়নের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে একইসাথে বিনিয়োগ প্রবাহের এই অনিশ্চয়তা ইকোসিস্টেমের কাঠামোগত দুর্বলতা, বিশেষত স্থানীয় পুঁজি ঘাটতিকে সামনে এনে দিয়েছে।
উজ্জ্বল সাফল্য বনাম নীরব ব্যর্থতার বহর
বাংলাদেশের স্টার্টআপ অঙ্গনে হাতে গোনা কয়েকটি সাফল্যের গল্প শিরোনাম হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু নীরব ব্যর্থতার ইতিহাস। বিকাশ, শপআপ, পাঠাও, এসব প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; কোটি কোটি গ্রাহক, ডলারের বিনিয়োগ এবং বাজার পরিবর্তনের গল্পে তারা স্বীকৃতি পেয়েছে। বিকাশ দেশে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। শপআপ দেশীয় খুচরা ব্যবসাকে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সিকোয়া ক্যাপিটালসহ শীর্ষ বিদেশি ভিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের সারি (Sary) কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হয়ে ১১০ মিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করে। রাইড-শেয়ারিং সেক্টরে পাঠাও বাংলাদেশের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং গো-জেকের মতো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পেয়েছে; তাদের কিছু শেয়ারহোল্ডার আংশিক এক্সিটও অর্জন করেছেন।
কিন্তু এই কিছু সাফল্যের বিপরীতে অসংখ্য স্টার্টআপ তাদের যাত্রার প্রথম বছরগুলোতেই বিনিয়োগের অভাব, যথেষ্ট মার্কেটা না পাওয়া বা স্কেলিং–এ ব্যর্থতার কারণে চুপচাপ বন্ধ হয়ে গেছে। গত এক দশকে দেশে স্টার্টআপের সংখ্যা ১০০ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২,৫০০–র বেশি সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পৌঁছালেও, মোট বিনিয়োগের সিংহভাগ গেছে অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের(শপআপ, পাঠাও) পেছনে। অর্থাৎ, বৃহৎ সংখ্যক স্টার্টআপ পর্যাপ্ত পুঁজি পায়নি কিংবা পেলেও টিকে থাকতে পারেনি।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০–৯০% স্টার্টআপ তাদের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ আরও চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় ব্যর্থতার হার যে বিশ্ব গড়ের চেয়ে কম নয় এমনটাই ইঙ্গিত করে ডেটা। সঠিক মেন্টরশিপের অভাব, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বলতা এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনা অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্যোগকে মাঝপথেই ডুবিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে আলোচিত একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের অনিয়ম পুরো খাতের ওপর আস্থার বড় ধাক্কা দেয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠাতা প্রাথমিক পর্যায়ে অল্প বিনিয়োগ পেয়ে হাইপ তৈরি করতে পারলেও টেকসই রেভিনিউ মডেল না থাকায় বা পরের রাউন্ডের বিনিয়োগ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে বাজার থেকে চুপচাপ বাজার থেকে হারিয়ে গেছেন।
মিডিয়ায় কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বারবার তুলে ধরা হয় বলে বাস্তব চিত্রটি আড়ালে থেকে যায়। “স্টার্টআপ” শব্দটি তরুণদের আকৃষ্ট করলেও এর পেছনে যে কঠিন পরিসংখ্যান, ব্যর্থতার সংখ্যা সফলতার তুলনায় বহু গুণ বেশি, তা উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মনে রাখা জরুরি।
আরেকটি কাঠামোগত সমস্যা হলো এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো স্টার্টআপ সম্পূর্ণ এক্সিট (অর্থাৎ আইপিও বা বড় অধিগ্রহণের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ মুনাফাসহ প্রস্থান) অর্জন করতে পারেনি। পাঠাওয়ের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার বিক্রির আংশিক সুযোগ সৃষ্টি হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ, লাভজনক এক্সিট নয়। ফলে উদ্যোগগুলোর “সফল পরিসমাপ্তি” ঘটছে না, বিনিয়োগকারীদের অর্থ দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে এবং নতুন বিনিয়োগে তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
এই এক্সিটহীনতা বাজারে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে, প্রতিষ্ঠাতারাও তাদের শ্রমের ও সফলতার পর্যাপ্ত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। এর ফলে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা “এঞ্জেল ইনভেস্টর” হিসেবে ফিরে আসার চক্র ভেঙে যাচ্ছে, যা যেকোনো পরিণত ইকোসিস্টেমের অনিবার্য অংশ।
কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা: কেন পিছিয়ে যাচ্ছে স্টার্টআপগুলো?
উপরে যে চিত্র উঠে এসেছে – অল্প কয়েকটির সাফল্য, বেশিরভাগের ঝরে পড়া – তার নেপথ্যে কিছু মূল কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ কাজ করছে।
প্রথমত, বাংলাদেশে স্টার্টআপ বাড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধার একটি হলো নীতি ও নিয়মকানুনের অসঙ্গতি। কখনও কোন খাতে লাইসেন্স পেতে জটিলতা, কখনও কর নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন, আবার কখনও দুটি সংস্থার পরস্পরবিরোধী নিয়মকানুন। এসব মিলিয়ে নতুন উদ্যোগের জন্য একটি অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ফিনটেক বা ই-কমার্স খাতে দীর্ঘদিন কোনো সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছিল না, পরবর্তীতে এসে নীতিমালা করা হলেও ততদিনে অনেক স্টার্টআপ অনিশ্চয়তায় ভুগেছে। বিউরোক্রেটিক জটিলতা এক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা – সরকারি তহবিল বা স্টার্টআপ সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করলেও সেই অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়া ধীরগতির, সরকারি অনুমোদন পেতে সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা ইত্যাদি সমস্যা অনেক প্রতিষ্ঠানকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট নন–কনভার্টিবল থাকা বড় বাধা। বাংলাদেশের সংবিধিবদ্ধ অর্থনীতি (non-convertible capital account) অনুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগ থেকে লাভ বা মূলধন ফেরত নেওয়ার জটিলতা অনেক আন্তর্জাতিক ফান্ডকে নিরুৎসাহিত করে। ফলে বহু সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ বাধ্য হচ্ছে সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত বা ডেলাওয়ারে হোল্ডিং কোম্পানি রেজিস্টার করতে, যাতে বিদেশি পুঁজি তুলতে সুবিধা হয়। এতে বাংলাদেশ রাজস্ব, মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ; তিন দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও লভ্যাংশ রেপ্যাট্রিয়েশনের বাধা ঠিকভাবে সমাধান না হলে বিদেশি পুঁজি ভবিষ্যতে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় বিনিয়োগের অভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে কর্পোরেট গ্রুপ, ব্যাংক, ধনী পরিবার – সবার কাছেই প্রচুর মূলধন রয়েছে, কিন্তু তা স্টার্টআপে আসছে না বললেই চলে। ২০২৪ সালে দেশে স্টার্টআপে স্থানীয় বিনিয়োগ ছিল মোট ফান্ডিংয়ের মাত্র ২%, এবং ২০২৫ সালেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। এর পেছনে ইনভেস্টমেন্ট কালচারের একটি বিষয় হলো অনেক স্থানীয় বিনিয়োগকারী স্টার্টআপে টাকা লাগিয়ে দ্রুত মুনাফা প্রত্যাশা করেন – ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে লাভ দেখতে না পেলে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। অথচ ভেঞ্চার ক্যাপিটালের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন;
- ৩–৭ বছরের আগে রিটার্ন আশা করা যায় না
- ১০ উদ্যোগে ৭–৮টি ব্যর্থ হলেও ১–২টি বড় সফলতা পুরো তহবিল উসুল করে দেয়
এই “পোর্টফোলিও থিওরি” সম্পর্কে সচেতনতা ও শিক্ষা এখনো যথেষ্ট নয়।
এছাড়া -
- সফল এক্সিট না থাকায় সিরিয়াল উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেনি
- এঞ্জেল নেটওয়ার্ক দুর্বল
- কর্পোরেট গ্রুপগুলো স্টার্টআপ অধিগ্রহণে আগ্রহী নয়
ফলে “লোকাল মানি” স্টার্টআপ ক্যাপ-টেবিলে আসে না; বড় বিনিয়োগকারীরা আলোচনায় আগ্রহী হলেও বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভেঞ্চারে অংশ নিচ্ছেন না।
চতুর্থত, এক্সিটের পথরুদ্ধ অবস্থা আগেই উল্লেখ করেছি, আইপিও বা অধিগ্রহণের নজির নেই, ফলে প্রথমদিকের বিনিয়োগকারীরা আটকে যান। এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেটের সীমাবদ্ধতাও। শেয়ারবাজারে এখনও লাভ-না-করা টেক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার মতো নমনীয়তা আসেনি; পাবলিক ইস্যু আইনকানুনও খুব কড়া, যেটা স্টার্টআপের সাথে খাপ খায় না। অন্যদিকে, কর্পোরেট সংস্থাগুলো স্টার্টআপ অধিগ্রহণে আগ্রহী নয়, বরং নিজেরাই প্রয়োজনবোধে সার্ভিস ডিভিশন খুলে নিচ্ছে বা বিদেশি প্রযুক্তি কিনে নিচ্ছে। ফলে, প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা লাভসহ বের হওয়ার রাস্তা না পেয়ে নতুন করে আর বিনিয়োগ করছেন না, ইকোসিস্টেমে টাকার চক্র থেমে যাচ্ছে।
পঞ্চম সমস্যা, হিউম্যান রিসোর্চ ও স্কেলআপ চ্যালেঞ্জ। একটি স্টার্টআপ ছোট স্কেলে শুরু করে সফল MVP (মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট) তৈরি করতে পারলেও, বড় আকারে বাজার ধরতে গিয়ে দক্ষ জনবল, ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামোর ঘাটতিতে হিমশিম খায়। দেশে অভিজ্ঞ প্রোডাক্ট ম্যানেজার, স্কেলআপ করার মতো অপারেশনস ম্যানেজার বা বিশেষায়িত দক্ষতা (উদাহরণ: ডেটা সায়েন্টিস্ট, হাই-স্কেল ইঞ্জিনিয়ার) এর সংকট রয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজার নিয়েও বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে –
- জনসংখ্যা ১৭ কোটি হলেও উপযুক্ত বাজার সাইজ তুলনামূলক ছোট
- উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন এখনো সবার হাতে পৌঁছেনি
- গ্রাহকের গড় ক্রয়ক্ষমতা সীমিত
ফলে যে পরিমাণ বাজার ভারতের মতো দেশে পাওয়া যায়, বাংলাদেশে ততটা পাওয়া কঠিন, বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল সেবা ছড়াতে ব্যয় বেশি পড়ে। ইন্টারনেটের উচ্চ খরচ ও নিম্ন গতি গ্রাহক বৃদ্ধির পথে বাধা তৈরি করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো এখনও বেশিরভাগই কিছু নির্দিষ্ট খাত (ফিনটেক, ই-কমার্স, এডুটেক ইত্যাদি) বা শহরকেন্দ্রিক সমস্যার সমাধানে লিমিটেড – বাজার বিভক্ত ও সংকীর্ণ হওয়ায় যথাযাথ স্কেল করা কঠিন হচ্ছে। অনেকে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক প্রসারণের (international expansion) কথা ভাবছেন, কিন্তু দেশের ভিত শক্ত না থাকলে বিদেশে প্রতিযোগিতা করা আরও চ্যালেঞ্জিং।
সব মিলিয়ে, একটি স্টার্টআপকে আইডিয়া থেকে ইউনিকর্ন হয়ে ওঠার যাত্রায় প্রতিটি ধাপে কাঠামোগত বাধার দেয়াল টপকাতে হচ্ছে। যাদের কাছে ব্যতিক্রমী সক্ষমতা, সঠিক নেটওয়ার্ক ও ধারাবাহিক পুঁজির জোগান নেই, তাদের বেশিরভাগই পথের মাঝেই থেমে যাচ্ছে। এরি বাইরে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকছে চরম প্রতিযোগিতা ও ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে।
ভিয়েতনাম-ভারতের সাথে তুলনা: কোথায় পার্থক্য?
বাংলাদেশের স্টার্টআপ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বুঝতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকানো জরুরি।
ভারতের কথা ধরলে, দেশটি ইতোমধ্যে ১০০টির বেশি ইউনিকর্ন জন্ম দিয়েছে। শুধু ২০২১ সালে ভারতের স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের তুলনায় বহু গুণ বেশি। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে ভারতেও কিছু বাজার সংশোধন চলছে – বাজুস (Byju’s) এর মতো একসময় আকাশচুম্বী ভ্যালুয়েশন পাওয়া স্টার্টআপ এখন দেউলিয়াত্বের মুখে, অর্থাৎ অতিরিক্ত হাইপ সেখানে থেকেও বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না সবসময়। তবে ভারতের শক্তি হলো দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় ভূমিকা, যা বাংলাদেশের নেই বললেই চলে। ভারতের বড় বড় কোম্পানি (রিলায়েন্স, টাটা) বা বিজনেস গ্রুপ নিয়মিত স্টার্টআপ কিনে নিচ্ছে বা তহবিল দিচ্ছে, সেই সঙ্গে সরকারের “Startup India” উদ্যোগ নীতিগত সুবিধা দিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়েছে। এর ফলে ভারতে প্রথমদিকের বিনিয়োগ থেকে এক্সিট পাওয়া এবং সেই পুঁজি পুনরায় নতুন স্টার্টআপে বিনিয়োগ হওয়ার যে প্রবৃদ্ধির চক্র (virtuous cycle) – তা কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশে সেটা অনুপস্থিত হওয়ায় প্রতিটি উদ্যোগই একপ্রকার গোড়া থেকে শুরু করছে এবং তহবিল ও মেন্টরশিপের একই অভাবের মুখোমুখি হচ্ছে বারবার।
ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একইরকম প্যাটার্ন দেখা যায়, যদিও দেশটির অর্থনীতি ও জনসংখ্যা বাংলাদেশের কাছাকাছি। ২০২১ সালটি ভিয়েতনামের জন্য টার্নিং পয়েন্ট; সে বছরে দেশটি প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, যেখানে বড় কিছু রাউন্ডে Tiki (ই-কমার্স), VNLIFE (পেমেন্ট) এবং MoMo (ফিনটেক) এর মতো প্রতিষ্ঠান ফান্ডিং পায়। বর্তমানে ভিয়েতনামে কমপক্ষে চারটি ইউনিকর্ন রয়েছে – MoMo (ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাপ), VNPay, VNG (গেমিং ও বিনোদন) এবং Sky Mavis (ব্লকচেইন/গেমিং)। এসব কোম্পানি মিলিয়ে বিলিয়ন ডলারের ওপরে তহবিল তুলেছে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে। ভিয়েতনামের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়: প্রথমত, দেশটির রপ্তানিমুখী অর্থনীতি ও এশিয়ান বাজারের সাথে সংযোগ (ASEAN এর সদস্য হওয়া ইত্যাদি) তাদের স্টার্টআপকে আঞ্চলিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও দৃশ্যমান করেছে, যেখানে বাংলাদেশ কিছুটা বিচ্ছিন্ন। দ্বিতীয়ত, ভিয়েতনামের স্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও কর্পোরেটরাও শুরু থেকে বিনিয়োগে যুক্ত – যেমন Vingroup, FPT ইত্যাদি নিজস্ব ভেঞ্চার সংস্থা বা তহবিল নিয়ে স্টার্টআপে বিনিয়োগ করছে। এর ফলে শুরুতেই দেশীয় “অ্যাঙ্কর” পুঁজি মিলে যায় এবং ধাপে ধাপে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবেশ করে। এদিকে বাংলাদেশে স্থানীয় উদ্যোগের অভাবে শুরুতেই অনেক আইডিয়া বিনিয়োগের অভাবে ঝরে যায়। তৃতীয়ত, নীতি সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ভিয়েতনামে উল্লেখ করার মত – ন্যাশনাল ইনোভেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা, কর প্রণোদনা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে তাদের সরকার, যাতে উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা শুরু করতে পারে। বাংলাদেশেও স্টার্টআপ নীতিমালা তৈরির কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন কতটা হবে তা এখনো অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশ এখনো পিছনে রয়েছে। স্টার্টআপ ব্লিংক র্যাঙ্কিং অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের তালিকায় ৭৯ নম্বরে অবস্থান করছে, যেখানে ভিয়েতনাম ৫৫ নম্বরে এবং ভারত শীর্ষ ২০ এর মধ্যে রয়েছে। পার্থক্য শুধু বিনিয়োগের অঙ্কেই নয়, ইকোসিস্টেমের গভীরতায়: ভারতে আজ সফল উদ্যোক্তা-নিবেশকারীদের প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, ভিয়েতনামে একাধিক ইউনিকর্নের সাফল্য দেখে নতুনরা উৎসাহিত হচ্ছে, আর বাংলাদেশে এখনো প্রথম ধারার সাফল্যের অপেক্ষাইয় আছে।
এগিয়ে যাওয়ার পথ: টেকসই প্রবৃদ্ধির দিশা
সকল চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারক - সবারই এখানে ভূমিকা রয়েছে।
- স্থানীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত ও সক্রিয় করা: শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে হলে ইকোসিস্টেমে দেশীয় পুঁজির অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। আলোচনা বা সেমিনারের বাইরে বাস্তব বিনিয়োগের টেবিলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, কর্পোরেট গ্রুপ ও উচ্চসম্পদশালী ব্যক্তিদের নিয়ে আসতে হবে। সরকারের উচিত কর রেয়াত বা কর সুবিধা দিয়ে স্টার্টআপ বিনিয়োগকে আকর্ষণীয় করা। পাশাপাশি ব্যাংক, বিমা, পেনশন তহবিলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভেঞ্চার অ্যাসেট ক্লাসে নির্দিষ্ট অংশ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কর্পোরেট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল গঠনে উৎসাহ দিলে বড় কোম্পানিগুলো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করবে এবং স্টার্টআপগুলো পাবে প্রয়োজনীয় তহবিল। একইসাথে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এঞ্জেল বিনিয়োগকারী নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যাতে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা ও ধনী ব্যক্তিরা নতুন উদ্যোগে পুঁজি দিতে আগ্রহী হন।
- নীতিগত সংস্কার ও সহজতর পরিবেশ: স্টার্টআপ-বান্ধব পরিবেশ গড়তে দ্রুত ও কার্যকর নীতি সংস্কার প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ ও এক্সিট সুবিধা নিশ্চিত করতে মূলধন হিসাব আংশিকভাবে হলেও উন্মুক্ত করার পথ খুঁজতে হবে কিংবা স্টার্টআপের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ কাঠামো (যেমন Regulatory Sandbox) চালু করা যেতে পারে। লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও বিদেশি শেয়ারহোল্ডার অনুমোদনের মতো প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে এক্সিটের সুযোগ তৈরিতে শেয়ারবাজারের কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা প্রয়োজন; প্রস্তাবিত এসএমই বোর্ড বা “স্টার্টআপ বোর্ড”-এ এমন কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে পারবে যারা এখনো লাভজনক নয় কিন্তু ভবিষ্যতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রাখে। পাশাপাশি অধিগ্রহণকে উৎসাহ দিতে কর ছাড় বা আর্থিক প্রণোদনার মতো নীতি বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
- বিকল্প বিনিয়োগ মাধ্যম ও ফান্ডিং বৈচিত্র্য: শুধু ইক্যুইটি ভিত্তিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে ভেঞ্চার ঋণ, রাজস্ব ভাগাভাগিভিত্তিক বিনিয়োগ ইত্যাদির মতো বিকল্প ফান্ডিং মডেল চালু করা প্রয়োজন। এতে সেইসব ব্যবসা, যাদের ইউনিকর্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও বাজারে টিকে থাকার সামর্থ্য আছে, তারাও তহবিল পাবে। ব্যাংকগুলোকে স্টার্টআপ ফাইন্যান্সিংয়ে যুক্ত করার সাম্প্রতিক উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবে সুবিধা পেতে হলে শর্ত ও প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে ফান্ড–অফ–ফান্ডস কাঠামো গঠন করা গেলে বিভিন্ন সেক্টরভিত্তিক বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
- শিক্ষা, দক্ষতা ও পরামর্শদাতা ব্যবস্থার উন্নতি: স্টার্টআপ কেবল পুঁজির ওপর দাঁড়ায় না—এর পেছনে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ এবং জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ বাড়িয়ে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচিতে উদ্যোক্তা শিক্ষা, প্রোগ্রামিং, উদ্ভাবন এবং ব্যবসা পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলে দক্ষতা ও মানসিকতা দুই–ই গড়ে উঠবে। পাশাপাশি সফল প্রতিষ্ঠাতা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি শক্তিশালী মেন্টর নেটওয়ার্ক গঠনের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অ্যাক্সেলারেটর ও ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম চালু থাকলে ব্যর্থতার হার কমবে এবং বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ–যোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।
সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: ইকোসিস্টেমে আস্থা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তাদের নিজ উদ্যোগে সুশাসন বজায় রাখতে হবে। আর্থিক স্বচ্ছতা, বোর্ড পরিচালনা, অডিটিং ও গ্রাহক–বিনিয়োগকারী অধিকার রক্ষার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল আসবে। ইভ্যালির মতো ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে শুরু থেকেই আইনি কাঠামো, কাগজপত্র, কর ও রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স সঠিকভাবে অনুসরণ করা উচিত। বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে নারী প্রতিষ্ঠাতাদের জন্য বিশেষ তহবিল বা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা গেলে দলগত নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহুমাত্রিকতা আসবে।
এ বিষয়ে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে নারী নেতৃত্ব ও ইনক্লুসিভ ইনোভেশন প্রসঙ্গে জনাব নুরুল হাই বলেনঃ “জেন্ডার–লেন্স স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ইনক্লুসিভ ও ব্যাল্যান্সড গ্রোথ এবং ইনোভেশন সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্টার্টআপ বাংলাদেশ সবসময় বিনিয়োগ কৌশলে women empowerment–কে অগ্রাধিকার দেয়, এবং এই লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপ প্রোগ্রামে কাজ করছি। কারণ একজন নারীর ক্ষমতায়ন মানেই প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও শিক্ষায় নতুন সমাধান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া। আর আমরা বিশ্বাস করি যেখানে নারী এগিয়ে যায়, সেখানেই ইকোসিস্টেম আরও ইনক্লুসিভ, মানবিক এবং টেকসইভাবে বৃদ্ধি পায়।”
শেষ পর্যন্ত, বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিপুল – জনসংখ্যার গঠন, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং ডিজিটাল গ্রাহকের উত্থান এই খাতকে চালিকা শক্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের কল্পনার পাশাপাশি কঠিন বাস্তবের প্রতি নজর দিতে হবে। কেবল বাহারি গল্পের পিছনে না ছুটে শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে হবে। যথাযথ নীতি সহায়তা, স্থানীয় বিনিয়োগের অংশগ্রহণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই হয়তো আগামী এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ-জগতে নতুন বিপ্লব ঘটবে। স্বপ্ন তখন বাস্তব সফলতা হিসেবে ধরা দেবে, এবং একের পর এক “ফান্ডিং আর ফ্লপের গল্প” পেরিয়ে আমরা টেকসই উদ্যোক্তা সংস্কৃতির দৃঢ় ভিত্তি দেখতে পাব। সেই লক্ষ্যেই এখন তীক্ষ্ণ কিন্তু গঠনমূলক দৃষ্টি নিয়ে কাজ করা জরুরি – আজকের নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এটাই সময়ের দাবি।
লেখকঃ আকরাম হোসেন, উপ-ব্যবস্থাপক, ডিজিটাল মিডিয়া, ডিবিসি নিউজ