যুদ্ধকালীন অস্থিরতা এবং কট্টরপন্থী নেতৃত্বের পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে ইরানে নারীদের বাধ্যতামূলক হিজাব পরা সংক্রান্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কটি আবারও সামনে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার সময়েও সরকারপন্থী সমাবেশ এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হিজাব ছাড়া অনেক নারীকে অংশ নিতে দেখা গেছে, কারণ তখন নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগ ছিল বড় জাতীয় সংকটগুলোর দিকে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশটির রক্ষণশীল আলেম ও রাজনীতিকদের পক্ষ থেকে কথিত ‘পাবলিক ন্যুডিটি’ বা প্রকাশ্য শালীনতাহীনতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরদার হচ্ছে।
এই কড়া নজরদারি ও সতর্কবার্তা সত্ত্বেও বহু ইরানি নারী প্রকাশ্যে হিজাব সংক্রান্ত নিয়ম উপেক্ষা করছেন। মার্কিন সংকট সামলানো, গভীর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কর্তৃপক্ষ আপাতত বড় ধরনের সরাসরি দমন অভিযানে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করছে। তবে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে বিভিন্ন শহরের ক্যাফে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের খবর প্রচার করা হচ্ছে। অধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রাজধানী তেহরান ও দক্ষিণ খোরাসানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শালীনতা লঙ্ঘন ও বাধ্যতামূলক হিজাব নীতি না মানার অভিযোগে বেশ কিছু ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও পোশাকের দোকান সিলগালা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
চার বছর আগে সঠিক পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে আটক অবস্থায় তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ‘নারী, জীবন, মুক্তি’ আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হলেও নারীদের মধ্যে নিয়মের প্রতি অবাধ্যতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাজপথে তরুণীদের হেলমেট পরে কিন্তু হিজাব ছাড়া স্কুটার চালাতে দেখা যাচ্ছে এবং এই ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। অধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, জনসমক্ষে অবাধ্যতা প্রকাশের অপরাধে বহু অনলাইন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে এবং সংগীতশিল্পী পারাস্তু আহমাদিসহ তাঁর দলের সদস্যদের দোররা ও নিষেধাজ্ঞার মতো সাজাও দেওয়া হয়েছে।
কট্টরপন্থীরা প্রশাসনের ওপর হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকরের জন্য ধর্মীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতার কথা বলে চাপ বাড়ালেও সরকারের ভেতরে ভিন্নমতও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস বা আচরণ পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে এটিকে সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্যদের একাংশও মনে করছেন যে, যুদ্ধক্লান্ত জনমতের মধ্যে এই সংকটময় সময়ে হিজাবের চেয়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির দিকেই প্রশাসনের বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। কঠোর শাস্তির আইন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও নারীদের ওপর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে, তবে সাধারণ মানুষের ধারণা, আগের মতো বলপ্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের পক্ষে কঠিন হবে।
সূত্র: সিএনএন