মুমূর্ষু রোগী পরিবহনের জন্য বরাদ্দ সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। অথচ সেই অ্যাম্বুলেন্সের চালক ব্যস্ত সিভিল সার্জনের ব্যক্তিগত গাড়ি চালাতে! এভাবেই প্রায় নয় মাস ধরে চালক-সংকটে পড়ে আছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি। ফলে জরুরি প্রয়োজনে বিপাকে পড়ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালককে সিভিল সার্জনের দাপ্তরিক গাড়ি চালানোর কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার সদর কিংবা সিলেটে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এই অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহারের কথা। চালক না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হচ্ছে এই জরুরি সেবা।
ভুক্তভোগী এক রোগীর স্বজন কালাম বলেন, ‘সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় জরুরি মুহূর্তে আমাদের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি টাকা খরচ হচ্ছে, যা দরিদ্র মানুষের জন্য বহন করা খুবই কষ্টকর।’
অ্যাম্বুলেন্সের চালককে নিজের গাড়িতে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘জুড়ীতে অ্যাম্বুলেন্সের সার্ভিস ও প্রয়োজন কম। তাই পছন্দ করে নিয়ে আসছি। সিভিল সার্জনের গাড়ি তো বন্ধ থাকতে পারে না! আমি না চললে সব উপজেলা ও এর সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবে।’
তাঁর এমন মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। জুড়ী প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘একজন কর্মকর্তার সরকারি গাড়ি সচল রাখার চেয়ে মুমূর্ষু রোগীর জরুরি পরিবহন নিশ্চিত করাই কি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত নয়? দ্রুত জুড়ীর সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দরকার।’
এদিকে ‘স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিক ফোরাম’-এর অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি টেন্ডার একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ গ্রহণ এবং কর্মীদের বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ কেটে রাখার অভিযোগও আনা হয়েছে সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে। এছাড়া দাপ্তরিক কক্ষ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, টাকা ছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কোনো কাজ হয় না। টাকা না দিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক মো. এহসানুল হক জানান, বিভিন্ন সময় অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন 'দেখছি', 'ব্যবস্থা নেবো' বলে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই আমি খারাপ হিসেবে বিবেচিত হবো।’ নিজেকে মৌলভীবাজারের এযাবতকালের সবচেয়ে 'ভদ্র ও রুচিশীল' কর্মকর্তা হিসেবেও দাবি করেন তিনি। তবে অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অসুস্থতার কথা বলে তিনি দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘সিভিল সার্জনের কথাগুলো সম্পূর্ণ অপেশাদারিত্বের লক্ষণ। একজন সিভিল সার্জনের কাছ থেকে এ ধরনের কথা মোটেও কাম্য নয়। জনগণের সেবা সবার আগে। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিবিসি/এফএইচআর