পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও পরিবার মরদেহ নিতে এগিয়ে না আসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চার দিন ধরে হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল প্রতিবন্ধী খোকন মিয়ার নিথর দেহ। শেষ পর্যন্ত কোনো স্বজন না আসায় মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে সামাজিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর মানবিক উদ্যোগে বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণজনিত চর্মরোগ ‘সেলুলাইটিস’ নিয়ে খোকন মিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। সেখানে টানা ৩৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ মর্গে রাখা হয় এবং পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের সন্ধানে যোগাযোগ শুরু করে পুলিশ ও বাতিঘর কর্তৃপক্ষ।
খোকন মিয়ার আদি বাড়ি লক্ষ্মীপুরে হলেও তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের করুইন গ্রামে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড যাচাই করে তাঁর স্ত্রী নিলুফা আক্তার ও দুই ছেলে রাজু ও রানার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে যোগাযোগ করা হলে তারা খোকনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে আগে থেকেই অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর পর মরদেহ নিজ এলাকায় দাফন করার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ও যাবতীয় খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তাঁরা মরদেহ নিতে রাজি হননি। সর্বশেষ গত সোমবার ছোট ছেলে রানা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তারা মরদেহ গ্রহণ করবেন না এবং হাসপাতালেই যেন দাফন করে ফেলা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম জানান, আইনি ও মানবিক উভয় পক্ষ থেকেই পরিবারকে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা মরদেহ নিতে অনড় থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি বাতিঘরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, দীর্ঘকাল পারিবারিক যোগাযোগ না থাকার অজুহাতে পরিবারটি এই সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জি. মো. আজহার উদ্দিন বলেন, “মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা খোকন মিয়ার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর নিজ রক্ত সম্পর্কের মানুষদের এমন অনাগ্রহ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কোনো উপায় না দেখে আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন করেছি।”
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি মানুষ বেঁচে থাকতে যেমন অবহেলার শিকার হয়েছেন, মৃত্যুর পরও আপনজনরা তাঁকে গ্রহণ করেনি। তবে বাতিঘর যে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে, তা সমাজে একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ডিবিসি/পিআরএএন