বিশ্বনেতাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত রসায়ন এক বিরল দৃষ্টান্ত। মঙ্গলবার (১৯ মে) বেইজিংয়ে পুতিনের রাষ্ট্রীয় সফরে দুই দেশের সুদৃঢ় সম্পর্ক ও তাদের এই ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেই পুতিনকে বরণ করতে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গার্ড অব অনার এবং এরপর দুই নেতার অনানুষ্ঠানিক চা-চক্রের আয়োজন করা হয়েছে।
তুলনামূলক গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হলেও শি জিনপিং প্রায়ই পুতিনকে তার ‘সবচেয়ে ভালো ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দেন। ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে পশ্চিমা যেকোনো নেতার তুলনায় পুতিনের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৪০ বারেরও বেশি সাক্ষাৎ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। গত কয়েক বছরে তাদের এই সম্পর্ক কেবল দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বা রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একসঙ্গে রান্না করা, ভদকা পান, বুলেট ট্রেনে ভ্রমণ কিংবা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জন্মদিন উদযাপনের মতো সৌহার্দ্যপূর্ণ মুহূর্তও বিশ্ববাসী দেখেছে।
দুই নেতার বন্ধুত্বের বেশ কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে এপেক সম্মেলনে যোগ দিয়ে শি জিনপিং পুতিনের ৬১তম জন্মদিনে কেক উপহার দেন এবং দুজন মিলে ভদকা পান করেন। পরবর্তীতে পুতিন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শি জিনপিংই একমাত্র বিশ্বনেতা যার সঙ্গে তিনি জন্মদিন উদযাপন করেছেন। এরপর ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়া আক্রমণ করে (যা বর্তমান ইউক্রেন সংকটের জন্ম দিয়েছে), তখন পুতিনকে সমর্থন দেওয়া হাতেগোনা কয়েকজন নেতার মধ্যে শি জিনপিং ছিলেন অন্যতম। ওই বছরই রাশিয়ায় সোচি শীতকালীন অলিম্পিকে যোগ দিয়ে শি বলেছিলেন, প্রতিবেশীর আনন্দের অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা জানানোই চিরায়ত চীনা রীতি।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জুনে পুতিনের চীন সফরে দুই নেতা বেইজিং থেকে বুলেট ট্রেনে করে তিয়ানজিনে যান। সেসময় পুতিন নিজে চীনের ঐতিহ্যবাহী প্যানকেক ‘জিয়ান বিং গুওজি’ বানিয়ে শি জিনপিংয়ের পাতে তুলে দেন, আর শি তাকে উপহার দেন স্বর্ণের ‘ফ্রেন্ডশিপ মেডেল’। এর মাত্র তিন মাস পর রাশিয়ায় ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামের ফাঁকে তারা ঐতিহ্যবাহী রুশ প্যানকেক ‘ব্লিনি’ তৈরি করে ক্যাভিয়ার ও ভদকাসহ উপভোগ করেন।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে শি জিনপিং এক ধরনের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলছেন। তিনি বিশ্বমঞ্চে চীনকে শান্তিকামী দেশ হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক আরও নিবিড় করেছেন। এর অংশ হিসেবেই ২০২৪ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ‘ঝংনানহাই’ উদ্যানের লেকের ধারে বসে দুই নেতা চা পানের পাশাপাশি কৌশলগত নানা বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই একই উদ্যান পরিদর্শনে গেলে শি জিনপিং তাকে জানান, এখানে বিদেশি কোনো নেতাকে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা খুবই বিরল এবং সেই অল্প কয়েকজন নেতার মধ্যে ভ্লাদিমির পুতিনও রয়েছেন।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
ডিবিসি/এফএইচআর