ফ্রান্স এবং স্পেনে চরম তাপপ্রবাহ ও প্রবল বাতাসের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও আগুন ক্রমেই লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছে। আগুনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এবং সুরক্ষার তাগিদে গত এক সপ্তাহে দেশ দুটির অন্তত দুই লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা ঘরে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আটলান্টিক উপকূলের কাছে, বিশেষ করে বোরদো শহরের আশপাশে সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক দাবানলগুলো জ্বলছে। জিরোন্দ এবং লঁদ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আগুনে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজার একরের বেশি ভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নিয়া জানিয়েছেন, আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে এটি নিজস্ব বায়ুপ্রবাহ তৈরি করছে এবং প্রতিনিয়ত দিক পরিবর্তন করছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বোরদো শহরের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরতলী এবং জনপ্রিয় অবকাশযাপন কেন্দ্র ক্যাপ ফেরেট থেকে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাদের অনেকেই নৌকায় করে এলাকা ছেড়েছেন। পাশাপাশি, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ভার এলাকার দাবানল নিয়েও কর্তৃপক্ষ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে, স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের পার্বত্য এলাকাগুলোতে সৃষ্ট দাবানলও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ১৫ হাজার একর জমি পুড়ে গেছে এবং ১৯ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো এই ঘটনাকে অঞ্চলটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে শনিবারের দিকে বাতাসের বেগ কিছুটা কমে আসায় এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতির আশা করা হচ্ছে।
দাবানল মোকাবিলায় ফ্রান্স ও স্পেন উভয় দেশই জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছে। হাজার হাজার অগ্নিনির্বাপক কর্মীর পাশাপাশি হেলিকপ্টার এবং বিশেষ বিমান অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ উদ্ধারকাজে সহায়তা করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী মাঠে এক হাজারেরও বেশি সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। এছাড়াও, দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে সাধারণ মানুষ ও জরুরি কর্মীদের সুরক্ষার জন্য ফ্রান্স সরকার ১৫ লাখ ফেস মাস্ক পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এই সাম্প্রতিক দাবানলে সরাসরি কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও বহু দমকলকর্মী আহত হয়েছেন এবং অসংখ্য বসতবাড়ি ও ক্যাম্পসাইট সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। এর আগে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে স্পেনের আলমেরিয়া প্রদেশে দাবানলে ১৩ জন নিহত হন এবং ফ্রান্সে আগুন নেভাতে গিয়ে দুজন দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়। মূলত মে মাসের পর থেকে শুরু হওয়া ঘন ঘন তাপপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এই ধ্বংসাত্মক দাবানলের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাপপ্রবাহের কারণে গাছপালা শুকিয়ে যাওয়া এবং ইউরোপজুড়ে রেকর্ডভাঙা উষ্ণতার কারণে আগুন এত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট
ডিবিসি/পিআরএএন