সোমবার আমস্টেলভিনের ওয়াগেনার স্টেডিয়ামে পুল ‘ই’-তে নিজেদের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৫-৩ গোলে হেরে এফআইএইচ হকি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে ওঠার আশা শেষ হয়ে গেছে ভারতের।
ম্যাচের প্রথম ছয় মিনিটের মধ্যেই হোয়াকিন তোসকানি ও নিকোলাস দেলা তোরের গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। দশম মিনিটে ভারতের হয়ে একটি গোল শোধ করেন সুখজিৎ সিং। তৃতীয় কোয়ার্টারে গোল করে আর্জেন্টিনাকে আবার দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে দেন তোমাস দোমেনে। পরে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন তিনি। লুকাস তোসকানির গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-১। চতুর্থ কোয়ার্টারের শেষ দিকে সুখজিৎ নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এবং হার্দিক সিং পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে গোল করলে পরাজয়ের ব্যবধান কিছুটা কমায় ভারত।
এই জয়ে আর্জেন্টিনার সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ছয় পয়েন্ট। পুল ‘ই’ থেকে কোন দুটি দল সেমিফাইনালে যাবে, তা জানতে এখন তাদের নেদারল্যান্ডস-ইংল্যান্ড ম্যাচের ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। পুলের তলানিতে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করা ভারত এখন সপ্তম-অষ্টম স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলবে।
ম্যাচের শুরুটা আর্জেন্টিনার জন্য এর চেয়ে জোরালো আর হতে পারত না। এক মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগেই ডান দিক থেকে গোলমুখে পাঠানো বলটি সংকীর্ণ কোণে পেয়ে জালে জড়িয়ে দেন হোয়াকিন তোসকানি। শুরু থেকেই চাপে পড়ে ভারত। গতিময় আক্রমণ চালিয়ে আর্জেন্টিনা বারবার ভারতের রক্ষণ ও মাঝমাঠকে অপ্রস্তুত করে তোলে।
তৃতীয় মিনিটে জারমানপ্রীত সিং ইচ্ছাকৃতভাবে স্টিক দিয়ে বল বেসলাইনের বাইরে পাঠিয়েছেন বলে সিদ্ধান্ত দেন আম্পায়ার। এতে আরেকটি পেনাল্টি কর্নার পায় আর্জেন্টিনা। মোহিত দুর্দান্ত সেভ করলেও স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ষষ্ঠ মিনিটে যশদীপ সিওয়াচের আরেকটি দুর্বল রক্ষণাত্মক চ্যালেঞ্জে পেনাল্টি কর্নার পায় আর্জেন্টিনা। নিকোলাস দেলা তোরে মোহিতের ডান পাশ দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।
ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে ভারত। দশম মিনিটে একটি আক্রমণ তৈরিতে সহায়তা করেন অভিষেক। শেষ পর্যন্ত বল পান সুখজিৎ, যার জোরালো পুশ জালে জড়ালে ব্যবধান কমে ২-১ হয়। তবে আর্জেন্টিনা বিপজ্জনকই ছিল। কোয়ার্টার শেষ হওয়ার আগে ভারতের ২৩ মিটার এলাকায় একটি উঁচু বল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন অমিত রোহিদাস। ঠিক সময়েই হুটার বেজে ওঠায় আরেকটি গোল হজম করা থেকে বেঁচে যায় ভারত।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে কোনো গোল হয়নি। তবে বলের দখলকে পরিষ্কার সুযোগে রূপ দিতে হিমশিম খায় ভারত। আর্জেন্টিনা নিয়মিত উঁচু বল ব্যবহার করে ভারতের মাঝমাঠ এড়িয়ে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কাছে বল পৌঁছে দেয়। আদিত্য অর্জুন লালাগে, দিলপ্রীত সিং, সঞ্জয় ও হার্দিক সিংয়ের মাধ্যমে ভারত কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের কারণে সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি।
তৃতীয় কোয়ার্টারেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। কোয়ার্টারের শুরুতে আর্জেন্টিনার আরেকটি পেনাল্টি কর্নার ঠেকিয়ে দেন মোহিত। ভিডিও রেফারেলের পর পুনরায় পেনাল্টি কর্নার দেওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার আবেদনও খারিজ হয়। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় বল হারান সঞ্জয়। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আক্রমণে উঠে তোমাস দোমেনের গোলে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
এরপর একের পর এক পেনাল্টি কর্নার পেয়েও হতাশ হতে হয় ভারতকে। হারমানপ্রীত সিংয়ের ড্র্যাগফ্লিকগুলো বারবার আর্জেন্টিনার প্রথম রাশারের গায়ে লাগে অথবা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। যশদীপ, হার্দিক ও জারমানপ্রীতের সমন্বয়ে গড়া একটি আক্রমণ থেকে পাওয়া আরেকটি পেনাল্টি কর্নারও কাজে লাগাতে পারেনি ভারত। তাদের নেওয়া রেফারেলও ব্যর্থ হয়।
৪৫তম মিনিটে ব্যবধান আরও বাড়ায় আর্জেন্টিনা। মোহিত পরপর দুটি সেভ করেন। তবে আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রচেষ্টায় গোলের সামনে যশদীপের শরীরে বল লাগলে পেনাল্টি স্ট্রোক দেওয়া হয়। সেখান থেকে কোনো ভুল না করে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন দোমেনে। আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ৪-১ ব্যবধানে।
শেষ কোয়ার্টারে ভারত সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ৫৩তম মিনিটে আবার আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। পর্যাপ্ত সময় ও জায়গা পেয়ে শক্তিশালী টমাহক শটে সুরজ কারকেরাকে পরাস্ত করেন লুকাস তোসকানি। স্কোর ৫-১ হয়ে গেলে ম্যাচটি কার্যত ভারতের নাগালের বাইরে চলে যায়।
৫৮তম মিনিটে মানদীপ সিংয়ের ক্রস প্রথম স্পর্শে চমৎকার ডিফ্লেকশনের মাধ্যমে জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন সুখজিৎ। এক মিনিট পর বৃত্তের মধ্যে তাঁকে ফেলে দেওয়া হলে পাওয়া পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে গোল করেন হার্দিক। এতে ব্যবধান কমে ৫-৩ হয়।
শেষ হুটারের ঠিক আগে হারমানপ্রীত একটি পেনাল্টি কর্নার আদায় করলে ভারত শেষ সুযোগ পায়। তবে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক তোমাস সান্তিয়াগো দৃঢ়তার সঙ্গে সেটি ঠেকিয়ে দিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই থেকে ভারতের বিদায় নিশ্চিত করেন।
ডিবিসি/ আরএফই