কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ বা সতর্কতা ছাড়াই ভারতের গুজরাটে কচ্ছ জেলায় গত কয়েক দিনে ৩টি মসজিদ ও বেশ কয়েকটি মাজারসহ প্রায় ৩০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের (জেইউএইচ) একটি প্রতিনিধি দল উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করার পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ধর্মীয় নেতাদের অভিযোগ, এই উচ্ছেদ অভিযানের পেছনে কোনো আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে জমিয়তের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে কচ্ছে অবস্থান করছে। গত সোমবার (২৯ জুন) ভাঙা পড়া জুনা কান্ডলা মসজিদের তত্ত্বাবধায়কদের সঙ্গে দেখা করেছেন তারা।
জমিয়ত সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হাকিমুদ্দিন কাসমি সংবাদমাধ্যমকে জানান, তারা এই আকস্মিক উচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, আমরা জেলা কালেক্টর এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু প্রশাসন আমাদের কথা শুনছে না।
মাওলানা কাসমি অভিযোগ করেন, মসজিদের তত্ত্বাবধায়কদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন পুলিশ তাদের তাড়িয়ে দেয়। কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে তাকে সাথে সাথে আটক করা হয়।
জমিয়ত নেতার দাবি, উচ্ছেদের ঠিক আগে কর্মকর্তারা স্থানীয়দের সাথে সাধারণ কথাবার্তা বলছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ভারী পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে বুলডোজার চালানো শুরু হয়। এমনকি কোনো নোটিশ দেওয়ার বদলে কর্মকর্তারা বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত অভ্যাস নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন করছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন।
জমিয়তের প্রতিনিধি দলটি গান্ধিধাম তালুকের জুনা কান্ডলা মসজিদ এলাকা পরিদর্শন করে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৯৬৫ সাল থেকে এই মসজিদটি সরকারি ওয়াকফ রেকর্ডে নিবন্ধিত ছিল এবং এর একটি নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী ছিল।
মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সমর অভিযোগ করে বলেন, ২৯ জুন সকালে কোনো নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়। আমরা কারণ জানতে চাইলে পুলিশ আমাদের বাধা দেয়, সরিয়ে দেয় এবং হুমকি দেয়।
এছাড়া আদিপুরের জামা মসজিদও এই অভিযানে ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। জমিয়তের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট ৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে- ১১টি ধর্মীয় উপাসনালয় (মসজিদ ও মাজার), ১৭টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ২টি আবাসিক বাড়ি। এই উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় ২৫ জন স্থানীয় যুবককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
ভুজ তালুকে প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং সামগ্রিকভাবে কচ্ছ জেলায় প্রায় ২৫ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস। হঠাৎ করে একের পর এক ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙার এই ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে সমস্ত মসজিদ বা মাজার ওয়াকফ বোর্ডে বৈধভাবে নিবন্ধিত, সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে দেশের সংবিধান, আইন এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি মেনে চলাই কাম্য। ধর্মীয় সুড়সুড়ি বা আন্তর্জাতিক সীমান্তের দোহাই দিয়ে এই উচ্ছেদকে বৈধতা দেওয়া যায় না, কারণ আক্রান্ত এলাকাগুলো মূল সীমান্ত থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থিত।
সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা ভুজ জেলা প্রশাসনের সাথে দেখা করার চেষ্টা করছে। জমিয়তের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ আসাদ মাদানির কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বা উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ে নামবে তারা।
এদিকে গুজরাটের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাংঘভির সরাসরি নির্দেশেই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, সরকারি জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতেই এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ভেঙে ফেলা সমস্ত স্থাপনাই অবৈধ ছিল।
সূত্র: দ্য হিন্দুস্তান গ্যাজেট
ডিবিসি/এসএফএল