ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিকে ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (এইচএএল) অভিযোগ করেছে, হায়দরাবাদভিত্তিক ‘টিইসি অ্যারো ডিভাইসেস’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহের সময় ১৯৯টি জাল পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত, অডিট ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এইচএএল এই ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের করে।
এই জালিয়াতির তথ্য সামনে আসার পর টিইসি অ্যারো ডিভাইসেসকে ২০২৭ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং অনুমোদিত সরবরাহকারীর তালিকা থেকে নিষিদ্ধ করেছে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড। তবে এইচএএল জানিয়েছে, বিতর্কিত এই সরবরাহের বিপরীতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটিকে কোনও অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
এফআইআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৮ মার্চ থেকে এইচএএলের এয়ারক্রাফট ডিভিশন তেজস এমকে-১এ কর্মসূচির যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য টিইসি অ্যারো ডিভাইসেসকে ১৮টি ক্রয়াদেশ দেয়। এর আওতায় নমুনা, পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং অন্যান্য কারিগরি নথি যাচাইয়ের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৫ ধরনের যন্ত্রাংশের মোট ১৭২টি উপাদান উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। ক্রয় শর্ত অনুযায়ী, বড় পরিসরে যন্ত্রাংশ সরবরাহের সময় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে মূল পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিতে হতো। পরে টিইসি অ্যারো ডিভাইসেস বিভিন্ন গুণগত মানের সূচক, যেমন টেনসাইল স্ট্রেংথ, হার্ডনেস, ব্রেক লোড, শিয়ার, নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিং (এনডিটি), মাইক্রোস্ট্রাকচার এবং সল্ট স্প্রে পরীক্ষাসহ মোট ১৯৯টি পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরবর্তী যাচাইয়ে এইচএএলের মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ প্রতিবেদনে উল্লেখিত হায়দরাবাদের ‘অ্যাক্সিস ইনস্পেকশন সল্যুশনস’-এর কাছে এসব নথির সত্যতা জানতে চায়। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর পরিচালিত এক অডিটে এইচএএল জানতে পারে, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দেয়া ১৯৯টি প্রতিবেদনের একটিও অ্যাক্সিস ইনস্পেকশন সল্যুশনস থেকে ইস্যু করা হয়নি এবং সবগুলো প্রতিবেদনই জাল। অ্যাক্সিস ইনস্পেকশন সল্যুশনস এইচএএলকে নিশ্চিত করেছে যে, তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ও স্বাক্ষর জাল করে অপব্যবহার করা হয়েছে এবং তাদের অনুমতি ছাড়াই এই প্রতিবেদনগুলো তৈরি করা হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর এইচএএল প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং তাদের জবাব পর্যালোচনা ও অভ্যন্তরীণ আলোচনা শেষে নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্ত নেয়।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, এর আগে ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর বৈশ্বিক মঞ্চে ভারতের গর্ব তেজস বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে, যা দিল্লির যুদ্ধবিমান রপ্তানির স্বপ্নে বড় ধাক্কা ছিল। এরপর ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘ব্রেক ফেল’ করে আরও একটি তেজস যুদ্ধবিমান হারায় ভারত এবং পুরো বহর গ্রাউন্ডেড করা হয়। এই লাগাতার ত্রুটি ও বিধ্বস্ত হওয়ার জেরে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বড় মহড়া থেকেও তেজসকে বাদ রাখে ভারত। বর্তমান এই জালিয়াতির ঘটনায় অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগায় এফআইআর দায়েরে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে এ ঘটনায় মামলা নথিভুক্ত করেছে এবং জাল মাননিয়ন্ত্রণ সনদ জমা দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে আরও গভীর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি
ডিবিসি/এফএইচআর