ভারতের মধ্যপ্রদেশের দেওয়াসে গণবিবাহের নামে অভিনব প্রতারণার শিকার হয়েছে ৪২টি পরিবার। বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে পাতা এই জালিয়াতির ফাঁদে পড়ে বরযাত্রী নিয়ে পরিবারগুলো হাজির হলেও, শেষ পর্যন্ত কনের দেখা মেলেনি। যাদের ছেলেদের বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না, মূলত তাদের আবেগ ও দুর্বলতাকে পুঁজি করেই এই জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিভিন্ন মডেল ও তরুণীর ছবি নামিয়ে পাত্রপক্ষকে দেখাতো। এরপর ইন্দোরের একটি অনাথ আশ্রমের মেয়েদের সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয় তারা। এই প্রতারণার মাধ্যমে চক্রটি মোট ১০ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কথা ছিল ২৫ মে দেওয়াসে এই গণবিবাহ অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ২৪ মে মাতা টেকরি পরিদর্শনের পর রাধাগঞ্জের ক্লাব গ্রাউন্ডে বরপক্ষের থাকার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানানো হয়েছিল।
পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২৪ মে সকাল ৮টা থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে বর ও তাদের আত্মীয়স্বজনরা জীবনের অন্যতম বিশেষ দিনের সাজে রাধাগঞ্জ ক্লাব গ্রাউন্ডে উপস্থিত হতে শুরু করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, বিয়ের কোনো মণ্ডপ বা আয়োজন নেই, এমনকি কনেদেরও কোনো দেখা নেই। সেখানে উপস্থিত আয়োজক মুকেশ বৈরাগী ও তার স্ত্রী সুনীতা পরিবারগুলোকে বারবার আশ্বস্ত করতে থাকেন যে, ইন্দোর থেকে কনেরা পথে রয়েছে। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাদের অজুহাতও বদলাতে থাকে। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর পরিবারগুলো নিশ্চিত হয় যে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক মুকেশ বৈরাগী দাবি করেন, ইন্দোরে কর্মরত তার বড় ভাই দীনেশ দাস বৈরাগী তাকে অনাথ আশ্রমের মেয়েদের বিয়ের আয়োজনের কথা জানিয়েছিলেন এবং তিনিই বরের পরিবারগুলোর ফোন নম্বর সরবরাহ করেছিলেন। মুকেশের দাবি, বরপক্ষ দেওয়াসে পৌঁছানোর পর তিনি দীনেশকে ফোন করলে সে কনেদের নিয়ে দ্রুত আসার আশ্বাস দেয়, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া মুকেশের শ্বশুর নরসিংহ দাস বৈরাগী এই প্রতারণায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন বলেও তদন্তে জানা গেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়বীর ভাদোরিয়া জানিয়েছেন, ২৪ মে সন্ধ্যায় খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং অভিযোগকারী অভিষেকের সাথে কথা বলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩১৮(৪) ধারায় (প্রতারণা) একটি মামলা দায়ের করে। প্রধান অভিযুক্ত মুকেশ ও তার স্ত্রী সুনীতাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক দীনেশ ও নরসিংহ দাসকে ধরতে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। অভিযুক্তদের বাড়ি বিদিশা জেলায় হওয়ায় সেখানেও পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়েছে। আরেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা প্রীতি কাটারে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে এই ঘটনায় আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যে ৪২টি পরিবার নতুন পুত্রবধূ নিয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেছিল, তাদের সেই আনন্দের দিনটি শেষ হয় থানায় পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়েরের মধ্য দিয়ে। আর বরদের জন্য এই প্রতারণাটি ছিল চরম অপমানজনক ও ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত কষ্টদায়ক যেখানে বিয়ের মণ্ডপ থেকে শুরু করে কনে, সবকিছুই ছিল ভুয়া, কিন্তু তাদের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি ছিল একেবারেই বাস্তব।
সূত্র: এনডিটিভি
ডিবিসি/পিআরএএন