বিবিধ

ভেজালের ভিড়ে এক টুকরো ‘খাঁটি’ রাজশাহী: মুরাদের উদ্যোগে বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি

নিউজ ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

৭ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

রাজশাহীর গ্রামে গ্রামে ঘুরে আম কিনে বিক্রি করতেন মুন্তাজ আলী। বাবার সেই সনাতন ব্যবসাকেই আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন ছেলে মুরাদ পারভেজ। ঝুড়িতে করে হাটে না গিয়ে, তিনি এখন ফেসবুক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সারা দেশে পৌঁছে দিচ্ছেন খাঁটি আম, লিচু ও খেজুরের গুড়। তাঁর ই-কমার্স উদ্যোগ ‘ম্যাংগো লাভার’ এখন হাজারো মানুষের আস্থার প্রতীক।

বাবার পায়ে হাঁটা পথ এখন ডিজিটাল মহাসড়কে

রাজশাহীর গ্রাম থেকে গ্রামে ঝুড়ি মাথায় আম ফেরি করতেন মুন্তাজ আলী। বাবার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি আর সততার ঐতিহ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দেননি ছেলে মুরাদ পারভেজ। বরং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই সনাতন ব্যবসাকেই তিনি নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মুরাদ এখন আর ঝুড়ি নিয়ে হাটে যান না; ফেসবুক আর ওয়েবসাইটের ‘অর্ডার বাটন’-এ ক্লিক করেই তিনি সারা দেশে পৌঁছে দিচ্ছেন রাজশাহীর বিখ্যাত আম আর খাঁটি খেজুরের গুড়।

 

ডিগ্রি যখন মাটির গন্ধে 

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ফুড টেকনোলজি’ এবং ‘জনস্বাস্থ্য পুষ্টি’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন মুরাদ। ২০২০ সালে যখন ‘ম্যাংগো লাভার’ নামে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম চালু করেন, তখন আশপাশের অনেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়েছিলেন। শুনতে হয়েছে টিপ্পনী—‘এত পড়ে কী লাভ হলো? বাপের মতো সেই আমই বেচছে!’

কিন্তু মুরাদ জানতেন, তিনি কেবল পণ্য বেচছেন না, বেচছেন ‘বিশ্বাস’। ফুড টেকনোলজির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, মানুষের পাতে যেন ভেজালমুক্ত খাবার পৌঁছায়।

 

দিনেই বিক্রি ৩ হাজার কেজি গুড়! 

শুরুটা আম দিয়ে হলেও, মুরাদের আসল চমক এখন শীতকালীন খেজুরের গুড়। বর্তমানে তাঁর প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৩০০ ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কেজি গুড়।

সততা যেখানে পুঁজি, সেখানে ব্যবসার পরিধি বাড়তে সময় লাগে না। পবা ও দুর্গাপুর উপজেলার ১০৬ জন গাছি এখন সরাসরি মুরাদের তত্ত্বাবধানে গুড় তৈরি করেন। মুরাদের কড়া নির্দেশ—চিনি বা কোনো রাসায়নিকের স্পর্শও লাগবে না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় এই গুড়।

 

বদলে যাওয়া গ্রাম ও অর্থনীতি 

মুরাদের এই ‘ম্যাংগো লাভার’ উদ্যোগ শুধু তাঁর নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার চিত্র। একসময় যেসব খেজুরগাছ জ্বালানি হিসেবে কেটে ফেলা হতো, এখন তা এই অঞ্চলের মানুষের আয়ের উৎস। প্রায় ৬ হাজার গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৮০ জনের বেশি গাছি। প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৫ জন বেকারের।

 

ভোক্তা অধিকারের সিলমোহর 

অনলাইনে গুড় কেনা নিয়ে যখন হাজারো অভিযোগ, তখন মুরাদ ব্যতিক্রম। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘ই-কমার্সে ভেজাল গুড়ের ভিড়ে আমরা মুরাদের সরবরাহকারীদের সরেজমিনে যাচাই করেছি। তাঁরা সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গেই খাঁটি গুড় তৈরি করছেন, যা প্রশংসনীয়।’

 

দাম ও প্রাপ্তি 

মান ভালো হলে ক্রেতা দাম দিতে কার্পণ্য করেন না—তার প্রমাণ মিলছে মুরাদের ব্যবসায়। বর্তমানে ‘ম্যাংগো লাভার’-এ নালি গুড় ৩৯০ টাকা এবং পাটালি ও চকলেট গুড় ৪৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

 

উদ্যোক্তার কথা 

নিজের এই পথচলা নিয়ে মুরাদ পারভেজ বলেন, ‘আমার গ্রামে আমিই প্রথম পাবলিক ইউনিভার্সিটির ছাত্র। লোকে যখন হাসাহাসি করত, আমি তখন নীতিতে অটল ছিলাম। আমি পড়েছি পুষ্টিবিজ্ঞান নিয়ে, তাই মানুষকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোই আমার জেদ ছিল। আজ মানুষের সাড়া আমাকে প্রমাণ করেছে, আমি ভুল পথে ছিলাম না।’

আরও পড়ুন