ভেনিজুয়েলায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬০ জনেরও বেশি মানুষ। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন শত শত মানুষ। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে চলেছেন সাধারণ মানুষ।
বুধবার আঘাত হানা এই জোড়া ভূমিকম্পের দ্বিতীয়টি ছিল ভেনিজুয়েলার গত এক শতাব্দীর ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.৫। ভূমিকম্পে দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ উত্তরাঞ্চলের বহু ভবন ধসে পড়েছে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৪ বার আফটারশক (পরবর্তী কম্পন) অনুভূত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরে অবস্থিত ‘লা গুয়াইরা’ অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই রাজ্যেই দেশের প্রধান বিমানবন্দর সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর অবস্থিত।
লা গুয়াইরা থেকে নাতাশা দিয়াজ নামের এক মা জানান, একটি ধসে পড়া শপিং মলে তার ২২ ও ২৩ বছর বয়সী দুই মেয়ে আটকা পড়ে আছেন, যারা সেখানে ম্যানিকিউরিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ওরাই আমার সব। আমি শুধু ওদের ফিরে পেতে চাই।
ভেনিজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ এক টেলিভিশন ভাষণে জানিয়েছেন, অন্তত ১৭২ জন এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েক ডজন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা উদ্ধারকর্মীদের মাঝে আশার আলো জোগাচ্ছে।
দেশটির ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থা এই বিপুল সংখ্যক আহতের চাপে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় চিকিৎসক পেড্রো হাভিয়ের ফার্নান্দেজ বলেন, স্বাভাবিক সময়েই আমাদের হাসপাতালে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট থাকে। এই ভয়াবহ দুর্যোগের মুখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আমাদের জন্য চরম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা বিবেচনা করে জাতিসংঘ ও নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বৈশ্বিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো ও সুইজারল্যান্ড থেকে উদ্ধারকারী দল, বিশেষজ্ঞ কুকুর এবং ড্রোন ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৫০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য এবং যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এই ভয়াবহতার মধ্যেও লা গুয়াইরা অঞ্চলে ধসে পড়া কংক্রিটের নিচ থেকে একই পরিবারের তিন শিশুকে জীবিত উদ্ধারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশার আলো ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ভেনিজুয়েলার ফুটবলার হেক্টর বেলো জানান, ভূমিকম্পের সময় নিজের জীবন দিয়ে তাদের কন্যাসন্তানকে বাঁচিয়ে গেছেন তার স্ত্রী আন্দ্রেয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি লেখেন, তুমি আমাদের মেয়ের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিলে। আমি বড় হয়ে তাকে তোমার এই বীরত্বের গল্প শোনাব।
নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন, যার মধ্যে চারজন স্প্যানিশ, একজন পর্তুগিজ এবং দুজন ব্রাজিলিয়ান নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা গেছে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন এক সময়ে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানল, যখন দেশটি চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাত্র ছয় মাস আগে দেশটির দীর্ঘকালীন বামপন্থী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী কারাকাস থেকে গ্রেপ্তার করে মাদক পাচারের মামলায় নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। এরপর সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, যা নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক চলছে।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট এবং পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের অভাবে ভেনিজুয়েলা আগে থেকেই নাজুক অবস্থায় ছিল, যা এই দুর্যোগের উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/এসএফএল