কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ক্লাস চলাকালীন সময়ে আকস্মিকভাবে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের ছাদের অংশের প্লাস্টার খসে পড়েছে।সৌভাগ্যবশত, শিক্ষকের পূর্ব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ এবং ঘটনার মুহূর্তে নির্দিষ্ট স্থানে কেউ না থাকায় অল্পের জন্য বড় ধরণের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছে তৃতীয় শ্রেণীর কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (৮ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার কালীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে দুটি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে দুর্ঘটনা কবলিত ১নং (পুরাতন) ভবনটি ১৯৮৯ সালে নির্মিত হয়। মাঠ ভরাট করার কারণে পুরাতন ভবনটি বর্তমানে বেশ নিচুতে বা গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে, যা এর স্থায়ীত্বকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী কায়ফা, তানজিনা ও সামী মোল্লা জানায়, ক্লাস চলাকালীন সময়ে হঠাৎ ছাদ থেকে ছোট একটি পাথরের টুকরো খসে এক শিক্ষার্থীর বেঞ্চের পাশে পড়ে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে শিক্ষক দ্রুত শিক্ষার্থীদের কিছুটা দূরে সরিয়ে নেন। এর পরপরই একটি বিকট শব্দে ছাদের বিশাল একটি অংশ দুই বেঞ্চের মাঝখানের জায়গায় ভেঙে পড়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় আতঙ্কিত হয়ে শিক্ষার্থীরা চিৎকার করতে করতে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে আসে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশে থাকা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও ভয়ে শ্রেণীকক্ষ ছেড়ে বাইরে দৌড়ে পালায়। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পিংকর রায় ও শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম বলেন বলেন, এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবনটিকে দ্রুত পরিত্যক্ত ঘোষণা করা অত্যন্ত জরুরি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ অতি দ্রুত এই পুরাতন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে একটি নতুন ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হোক, যেন শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।
অভিভাবক রায়হান মিয়া বলেন, সকালে স্কুলে এসে দেখি ছাদের বিরাট বড় একটা আস্তর ভেঙে পড়ে আছে। আমাদের বাচ্চাদের ওপর যদি এটা পড়ত, তবে তারা নির্ঘাত মারা যেত। স্কুলে পাঠিয়ে যদি বাচ্চাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, তবে আমরা কীভাবে পাঠাব? সরকারের কাছে আবেদন, দ্রুত এটা পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নতুন ভবন দেওয়া হোক।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্চিতা রানী নাহা অভিযোগ করে বলেন, গত অক্টোবর মাসে ভূমিকম্পের পর এই ভবনের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল দেখা দেয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা শিক্ষা অফিস ও শিক্ষা প্রকৌশলী অফিসকে লিখিতভাবে জানানো হয়। তৎকালীন সময়ে প্রকৌশলী এসে ফাটল পরিদর্শন করে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, আগামী ১০ বছরেও এই ভবনের কিছুই হবে না। আজকের এই দুর্ঘটনা প্রকৌশলীর সেই গাফিলতি ও ভুল আশ্বাসকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাশের রুমে থাকা অবস্থায় প্রচণ্ড শব্দ শুনে আমি দৌড়ে যাই। গিয়ে দেখি ছাদ ধসে পড়েছে। অল্পের জন্য ২-৩ জন শিক্ষার্থী বেঁচে গেছে। এক শিফটের স্কুল হওয়ায় বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ৪টি শ্রেণীর কার্যক্রম চালাতে হচ্ছিল। কিন্তু আজ থেকে আমি আর একটা দিনও এই ভবনে ক্লাস করাব না। প্রশাসন আমাকে দিকনির্দেশনা দিক, এই কয়দিন আমি কীভাবে বিকল্প উপায়ে স্কুল চালাব।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার সিদ্দিকুর রহমান জানান, ঘটনার পর পরই প্রধান শিক্ষক তাকে ছবিসহ বিষয়টি অবগত করেছেন। তিনি বলেন, আমি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা শিক্ষা প্রকৌশলী মহোদয়ের সাথে কথা বলেছি। আমরা আগামীকাল সরজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাব। প্রকৌশলী মহোদয়ের কারিগরি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবনটি দ্রুত কনডেমড (পরিত্যক্ত) ঘোষণা করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা অফিসার আরও জানান, দুর্ঘটনার শিকার কক্ষটিতে ক্লাস না নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভবনটির বয়স প্রায় ৪০ বছর হয়ে যাওয়ায় নতুন ভবন নির্মাণের জন্য এটিকে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে। দ্রুতই ভবনটি নিলামের মাধ্যমে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
ডিবিসি/এফএইচআর