মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে লেবানন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, দেশটির পার্লামেন্টে সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড বাতিলের পক্ষে একটি আইন পাস হয়েছে। মঙ্গলবার পার্লামেন্টের স্পিকারের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বেশ কিছু সংশোধনী আনার পর আইনপ্রণেতারা এই বিলটি অনুমোদন করেছেন।
লেবাননের ১২৮ সদস্য বিশিষ্ট পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এই বিলোপের পক্ষে ভোট দিলেও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের সদস্যরা এর বিরোধিতা করেন। পার্লামেন্টে উপস্থিত আইনমন্ত্রী আদেল নাসের এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নতুন পাস হওয়া আইনে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং কঠোর শ্রমের বিধান রাখা হয়েছে।
লেবাননে ২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ওপর একটি অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ বহাল ছিল। তা সত্ত্বেও দেশটির আদালতগুলোতে বিভিন্ন সময় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ লেবাননের কারাগারগুলোতে ৮৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ছিলেন।
লেবাননের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের পরিচালক হেবা মোরায়েফ এটিকে লেবাননে মানবাধিকার রক্ষায় এক ‘বড় মাইলফলক ও বিজয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ার যে রেওয়াজ ছিল, তা এবার স্থায়ী আইনি সুরক্ষায় রূপ নিল। এর ফলে মানুষের জীবনের অধিকারের সুরক্ষা আরও সুদৃঢ় হবে এবং বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের যে প্রবণতা চলছে, তার সাথে লেবাননও যুক্ত হলো।
তবে নতুন আইনে উল্লেখিত ‘কঠোর শ্রম’ কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কয়েকজন আইনপ্রণেতাও শাস্তির এই অংশের বিস্তারিত প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। লেবাননের আইনে আগে থেকেই কঠোর শ্রমের বিধান থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম অর্থনৈতিক সংকট, সীমিত সম্পদ এবং কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত বন্দি থাকায় এই শাস্তি খুব কমই কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশটির পার্লামেন্টে একটি বিতর্কিত সাধারণ ক্ষমা আইন নিয়েও আলোচনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি পাস হলে ১৯৯০ সালে শেষ হওয়া ১৫ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের পর এটিই হবে সবচেয়ে বড় সাধারণ ক্ষমা আইন। এর ফলে সহিংসতার ঘটনায় দণ্ডিত কিছু ব্যক্তির সাজা কমানো হতে পারে, এমনকি কেউ কেউ মুক্তিও পেতে পারেন। তবে হামলায় নিহত লেবাননের সেনা ও নিরাপত্তাকর্মীদের স্বজনরা এই আইনের বিরুদ্ধে বারবার বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছেন। তাদের দাবি, স্বজনদের হত্যার জন্য দায়ীদের মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য ছিল; তাই তাদের সাজা কমানো বা মুক্তির বিষয়টি তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
সূত্র: আলজাজিরা
ডিবিসি/এফএইচআর