বাংলাদেশ, জেলার সংবাদ

মরতে বসেছে এক সময়ের স্রোতস্বিনী আড়িয়াল খাঁ নদ

ফারুক

ডিবিসি নিউজ

মঙ্গলবার ২৯শে মার্চ ২০২২ ০৬:৩৬:৩২ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

মরতে বসেছে এক সময়ের স্রোতস্বিনী আড়িয়াল খাঁ নদ। এখন আর নদ বলে চেনা যায় না তাকে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী সদরে মাত্র তিন কিলোমিটার জায়গায় আড়িয়াল খাঁর ওপর পাঁচটি বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে রাস্তা। আর এসব রাস্তা তৈরি হয়েছে সরকারি টাকায়।

কালের বিবর্তনে মৃতপ্রায় নদে পরিণত হয়েছে আড়িয়াল খাঁ।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি থানার সামনের সড়কটি তৈরি হয় আশির দশকে। এছাড়া উপজেলার ভরাদিয়া ও ফেকামারা-নয়াপাড়া এলাকায় আড়িয়াল খাঁর ওপর বাঁধ দিয়ে করা হয়েছে বড় সড়ক। 

শুধু তাই নয়, নদকে খণ্ড-বিখণ্ড করে সেতু না বানিয়ে নদীতে দেয়া হয়েছে আরো কিছু বাঁধ। সেগুলোতেও তৈরি হয়েছে সড়ক। আর সবই হয়েছে সরকারি টাকায়।

স্থানীয়রা জানান, নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ায় নৌকা  চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য আর হচ্ছে না। একই সাথে ক্ষেতে ফসল ফলানো যাচ্ছে না।  

স্থানীয়দের মতামত উপেক্ষা করে চরিয়াকোণা, খামখেয়ালির বাজার, গজারিয়া বাজারেও বাঁধ দিয়ে সড়ক করা হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করায় এখানকার পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। 

আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর একের পর এক বাধ দেয়ার প্রভাব পড়েছে পরিবেশ ও স্থানীয় কৃষিকাজে।

ভূক্তভোগীরা জানান, আড়িয়াল খাঁ নদ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে না আনলে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে। 

এতগুলো অবৈধ বাঁধ হলেও কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।  তবে দ্রুত বাধ অপসারণের আশ্বাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মতিউর রহমান জানান, অপরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করায় এই পরিণতি হয়েছে। 

সরকারি বরাদ্দের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে আলোচনা করে এর একটি সমাধান করা হবে। 

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের থেকে উৎপত্তি হয়েছে আড়িয়াল খাঁ নদের।সেখান থেকে একটি শাখা হয়ে কটিয়াদী সদরে মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুলিয়ারচর পর্যন্ত গেছে। 

পাঁচ কিলোমিটার জায়গায় পাঁচটি বাঁধ আড়িয়াল খাঁ নদের বুকের ওপর। সেই বাঁধগুলো দিয়ে সড়ক তৈরি করা হয়েছে। সড়ক দিয়ে চলছে যানবাহন। দুটি বড় বাঁধ বর্তমানে ব্যস্ত সড়কে পরিণত হয়েছে। নদে বাঁধ দেওয়ার ফলে দুই পাশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও স্থাপনা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দখল ও দূষণ। ফলে একসময়ের খরস্রোতা আড়িয়াল খাঁ এখন অস্তিত্ব সংকটে। এক নদে এত বাঁধ দেওয়ার ফলে মরা লাশে পরিণত হয়েছে আড়িয়াল খাঁ। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আড়িয়াল খাঁ নদ দিয়ে একসময় নৌ-পথে যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহন করা হতো। কিন্তু এখন এই নদে পানি নেই। নদের পাঁচ কিলোমিটার জায়গা মরে গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা সদরের থানার সামনে থেকে জালালপুর ইউনিয়নের ঝাকালিয়া পর্যন্ত একটি, কটিয়াদীর বীর নোয়াকান্দি-জালালপুরের চরনোয়াকান্দি বা খামখেয়ালির বাজারে দ্বিতীয়, কটিয়াদীর বরাদিয়া-জালালপুরের ফেকামারায় তৃতীয়, কটিয়াদীর চরিয়াকোণা-জালালপুরের ফেকামারায় চতুর্থ এবং লোহাজুরী-নাথের বাজারে পঞ্চম বাঁধ দেওয়া হয়েছে। প্রথম চারটি বাঁধ কটিয়াদী সদরের সঙ্গে জালালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশকে যুক্ত করেছে। শেষেরটি লোহাজুরীর দুটি অংশকে যুক্ত করেছে।

বেআইনিভাবে নির্মিত পাঁচটি বাঁধের মধ্যে সর্বশেষটি আংশিক অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। বাকিগুলোর ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

স্থানীয়রা জানান, আড়িয়াল খাঁ নদের বুকে প্রথম বাঁধ নির্মাণ করা হয় আশির দশকে। কটিয়াদী থানার সামনে থেকে এক কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধের ওপর দিয়ে পাকা সড়কও হয়েছে। এর দুই পাশে এখন অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এই বাঁধের প্রায় দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে জালালপুর অংশের খামখেয়ালি বাজার এলাকায় আরেকটি বাঁধ দেওয়া হয় ১০ থেকে ১২ বছর আগে। এটির ওপর ইট দিয়ে সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এটাও এখন ব্যস্ত সড়কে পরিণত হয়েছে। এরপর একে একে আরও তিনটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাস্তবে বড় ধরনের কোনও উন্নয়ন হয়নি। অথচ নদ মরে গেছে।

বাঁধগুলোর কারণে নদের কোথাও সামান্য জলাধার, কোথাও কিছু জলাবদ্ধতা, কচুরিপানার জঞ্জালের চিহ্ন নিয়ে টিকে রয়েছে। আড়িয়াল খাঁ নদের উৎপত্তি কিশোরগঞ্জের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে। সেখান থেকে একটি শাখা হয়ে কটিয়াদী সদরে মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুলিয়ারচর পর্যন্ত গেছে।

কটিয়াদী থানার সামনে নদের ওপর নির্মিত সড়কের পাশে চায়ের দোকানে চা পান করছিলেন শিক্ষক জয়নাল আবেদীন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আড়িয়াল খাঁ নদের পানিপ্রবাহ ফেরাতে হবে। এতে যদি ওই সড়ক ও দোকানপাট সরাতে হয়, তাহলে তা-ই করা উচিত। চলাচলের জন্য সড়ক প্রয়োজন হলে সেতু করা যেতে পারে, বাঁধ নয়।

সর্বশেষ নির্মিত বাঁধের বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাকুর রহমান বলেন, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির চার লাখ টাকায় ব্যয়ে বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ করে জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছি। এতে এলাকার উন্নয়ন হয়েছে।

এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে বাঁধ দেওয়ার বিষয়টি জানি। নদে বাঁধ দেওয়া বেআইনি। বাঁধ দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্টরা পাউবোর মতামত নেননি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। এরপর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জ্যোতিশ্বর পাল বলেন, এক থেকে দেড় বছর আগে নির্মিত সর্বশেষ বাঁধটি জেলা প্রশাসনের নির্দেশে অপসারণ করা হচ্ছে। আপাতত পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পুরনো বাঁধগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাছাড়া বাঁধগুলো অপসারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, নদে বাঁধ দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। ইতোমধ্যে সর্বশেষ নির্মিত বাঁধটি গত ৮ মার্চ অপসারণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এগুলো উচ্ছেদেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন