মেক্সিকোর কুখ্যাত ড্রাগ লর্ড নেমেসিও ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস ওরফে 'এল মেনচো'র মৃত্যুর পর দেশটির মাদক সম্রাটদের দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিশেষ বাহিনীর অভিযানে বন্দি অবস্থায় এল মেনচোর মৃত্যু হলেও মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলীয় সিনালোয়া রাজ্যের কুলিয়াকান শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামছে না। বরং প্রভাবশালী নেতাদের অপসারণের ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে ভয়াবহ এক 'কার্টেল যুদ্ধ'।
দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই শহরে প্যারামেডিক হিসেবে কাজ করছেন হেক্টর টরেস। বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, "ভয় এখন সর্বত্র এবং এই ভয় অবিরাম।" গত দেড় বছর ধরে সিনালোয়া কার্টেল নিজেদের মধ্যেই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত। এক নেতার ছেলের বিশ্বাসঘাতকতায় শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্বে শহরটি এখন কার্যত একটি বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। হেক্টর জানান, গত এক বছরে তাদের জরুরি ডাক আসার সংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শুধু মরদেহ উদ্ধার করছেন।
কার্টেল সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে খুবই কম। স্কুল, হাসপাতাল এমনকি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও হামলা চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি শহরের একটি শপিং মলের সামনে থেকে এক ব্যক্তির বিকৃত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাকে নৃশংসভাবে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছিল। মরদেহের পাশে ফেলে রাখা বার্তায় অন্য পক্ষকে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক এরনেস্তো মার্টিনেজ। ২৭ বছর ধরে এই সহিংসতা কভার করছেন তিনি জানান, শহরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল বাড়লেও খুনের হার কমেনি। গড়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
সহিংসতার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যা। রেনাল্ডা পুলিদো নামে এক মা, যার ছেলে ২০২০ সালে নিখোঁজ হয়েছিল, তিনি এখন 'মাদার্স ফাইটিং ব্যাক' নামক একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এক ডজনেরও বেশি মা প্রতিদিন মেটাল প্রোব ও কোদাল নিয়ে বিভিন্ন মাঠে ঘুরে বেড়ান তাদের সন্তানদের দেহাবশেষের সন্ধানে। রেনাল্ডা বলেন, "যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো মা তার সন্তানকে খুঁজে পাচ্ছে, সে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজবে।"
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মূলে রয়েছে 'ফেন্টানিল' নামক মরণঘাতি মাদকের বাণিজ্য। সিনালোয়া কার্টেলের একজন মাদক উৎপাদক 'রোমান' (ছদ্মনাম) জানান, সরকার যতই কড়াকড়ি করুক, ফেন্টানিল উৎপাদন ও পাচার থামবে না। তার মতে, "যতক্ষণ পর্যন্ত এই মাদকের ভোক্তা থাকবে, ততক্ষণ আমরা এটা তৈরি করে যাব।" প্রতিটি প্যাকেজ থেকে তারা হাজার হাজার ডলার মুনাফা করছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম দাবি করেছেন যে, তার সরকার মাদক পাচারের বিরুদ্ধে অগ্রগতি করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল সরবরাহ ৫০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। তিনি জানান, সিনালোয়ায় বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী কাজ করছে।
তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। প্যারামেডিক হেক্টর ও জুলিও যখন বুলেটবিদ্ধ ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেন, তখনও তাদের পরনে থাকে ১৪ কেজি ওজনের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তাদের মতে, পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে কখন কে কার গুলিতে প্রাণ হারাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/এসএফএল