বিনোদন, সংস্কৃতি

মানবতার সাধক মরমী কবি হাসন রাজার ১৬৭ তম জন্মদিন পালিত

Faruque

ডিবিসি নিউজ

বুধবার ২২শে ডিসেম্বর ২০২১ ০৩:১৪:৩১ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের একটি ধর্ম রয়েছে। যার নাম মানবতা। এই মানবতা সাধনার একটি রূপ হলো মরমী সাধনা। যে সাধনার ধারক মরমী কবি হাসন রাজা। যার গান ও দর্শনে মিশে আছে বাংলার মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ। ‍ যিনি গানে গানে সৃষ্টি করেছেন চেতনার এক লোকায়ত ঐক্যসূত্র। অনেকটা নীরবেই চলে গেলো এই মরমী কবির ১৬৭ তম জন্মদিন।

কখনো আধ্যাত্মিক প্রেম, কখনো জগৎ সংসারের প্রেম।  কখনো নশ্বর পৃথিবীর স্বল্পযাত্রার জীবনবোধের কথা।  মানবজীবন দর্শনকে হাছন রাজা কথাচ্ছলে, গানে, সুরে তুলে ধরেছেন সবসময়।

তাঁর সৃষ্টিতে মমত্ব, সংহতি এবং সহনশীলতার গভীর দর্শন যেমন রয়েছে, রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতাও।  জমিদার হয়েও প্রথার বাইরে গিয়ে হন মরমি কবি।  কালজয়ী সৃষ্টিতে বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে। 

হাছন রাজার বংশধর ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আরও বেশি গবেষণা হলে সমৃদ্ধ হতো নতুন প্রজন্ম।  

সুনামগঞ্জ উদীচীর সাবেক সভাপতি বিজন সেন রায় বলেন, হাসন রাজাকে নিয়ে আরো ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন। তিনি বলেন, হাসন রাজার অসাম্প্রদায়িক চেতনার গান কম গাওয়া হয়। ভাববাদ ও আধ্যাত্মিক গান বেশি চর্চা হয়। সবকিছুই গাইতে হবে, না হয় হাসন রাজাকে জানা হবে কম।

হাছন রাজা মিউজিয়ামের পরিচালক হাছন রাজার প্রপৌত্র সামারীন দেওয়ান বলেন, হাসন রাজাকে নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। তিনি বলেন, হাসন রাজাকে স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি হাসন রাজাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান।

ছোট পরিসরে হলেও জেলা শিল্পকলা একাডেমীর উদ্যোগে জানুয়ারিতে আয়োজন করা হবে হাছন রাজা স্মরণোৎসব।  তাঁর গান সংরক্ষণে  নেয়া হবে উদ্যোগ। 

জেলা সংস্কৃতি কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী জানান, হাসন রাজার জন্মদিন উপলক্ষে জানুয়ারিতে হাসন রাজা উৎসবের আয়োজন করেছে জেলা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এছাড়া, হাসন রাজার গান সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নিয়েছে শিল্পকলা কর্তৃপক্ষ।

১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১) সুনামগঞ্জ শহরের কাছে সুরমা নদীর তীরে লক্ষ্মণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে জন্ম নেন তিনি। হাছন রাজা পরাক্রমশীল জমিদার ছিলেন। একসময় তিনি তার সম্পদ জনকল্যাণে দান করে দিয়ে কয়েকজন সঙ্গিনী নিয়ে হাওরে হাওরে ভাসতে থাকেন। গুণী এই মরমি কবি বাংলা ভাষাভাষি মানুষ ছাড়াও উপমহাদেশেও সমাদৃত। শিশুকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত লক্ষণশ্রীই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

হাসন রাজার বাবা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার। হাসন রাজা তার তৃতীয় পুত্র। মায়ের নাম ছিল হুরমত বিবি। বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকে পাওয়া সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, রামপাশা, লক্ষণশ্রী আর সিলেটের একাংশ নিয়ে বিশাল অঞ্চলের জমিদার ছিলেন মরমী গীতিকবি হাসন রাজা। ১৫ বছর বয়সে তিনি জমিদারিতে অভিষিক্ত হন।

হাসন রাজার গানের বিচিত্রতা লক্ষ্যণীয়। তিনি লিখেছেন প্রেমের গান (জাগতিক প্রেম, আধ্যাত্মিক প্রেম, জগৎ সংসারের প্রেম)। তারপরও তার গানের প্রধান বিষয়বস্তু অনেকটা এরকম এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন একটা স্বল্প সময়ের জন্য। এখানে কেউই চিরস্থায়ী নয়। মানবিকবোধকে তিনি উচ্চ স্তরে স্থান দিয়েছেন যেখানে মমত্ব, ভ্রাতৃত্ব, সংহতি এবং সহনশীলতাবোধের গভীর দিকদর্শন রয়েছে, রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার কথাও।

হাসন রাজার গবেষণা-সাধনা ও শিল্পকর্ম ছিল গণকল্যাণমুখী। তিনি বিখ্যাত জমিদার ছিলেন, আবার সুরের সাধকও ছিলেন। কবির নিজের সৃষ্টিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দাঁড় করিয়ে গেছেন। লক্ষণশ্রীর ধনাঢ্য জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া হাছন রাজা তার জীবনের বিভিন্ন সময়ের গানে সহজ-সরল স্বাভাবিক ভাষায় মানবতার চিরন্তন বাণী উচ্চারিত হয়েছিল। তেমনি আধ্যাত্মিক কবিও ছিলেন তিনি। সব ধর্মের বিভেদ অতিক্রম করে তিনি গেয়েছেন মাটি ও মানুষের গান।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তার রচিত ২০৬টি নিয়ে গানের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এই সংকলনটির নাম ছিল ‘হাসন উদাস’। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাসন রাজার তিন পুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ্’ সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তার অনেক গান এখনও সিলেট-সুনামগঞ্জের লোকের মুখে মুখে আছে এবং বহু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


আরও পড়ুন