সনদনির্ভর প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে দেশে একটি দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই যথেষ্ট নয়; একজন প্রকৃত মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
আজ রবিবার (৭ জুন) সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণ দেশের জনগণের কেবল গণতান্ত্রিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি, বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। তবে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় আত্মত্যাগকারী সাহসী মানুষদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার্থে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রস্তুত করে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অটোমেশনের কারণে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের ধরনে যে বিশাল পরিবর্তন আসছে, তা মোকাবিলায় শিক্ষা কারিকুলামের আধুনিকায়নকে অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রযুক্তির কারণে পুরোনো অনেক পেশা বিলুপ্ত হলেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও উন্মোচিত হচ্ছে। তাই এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো টেকনোলজি এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির মতো সময়োপযোগী বিষয়গুলো কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবভিত্তিক করার কাজ শুরু করেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
দেশের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দুই হাজারের বেশি কলেজে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সবার জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে এবং ব্যবস্থাপনাগত সংকট নিরসনে ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকার পরও প্রায়োগিক দক্ষতার অভাবে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া, তরুণরা যাতে কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন, সেজন্য ক্যাম্পাস থেকেই প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি অর্জনের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শেখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেবে। পরিশেষে তিনি শিক্ষকদের সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত ও রোল মডেল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ছাত্র ও যুবশক্তিকে প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে স্বনির্ভর বাংলাদেশ অচিরেই বিশ্বের দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
ডিবিসি/পিআরএএন