যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধের মাঝেই মার্কিন জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার (১ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত চিঠিতে তিনি মার্কিন নাগরিকদের চলমান সংঘাত ও ইরান সম্পর্কে ছড়ানো ভুল তথ্যের ফাঁদ এড়িয়ে প্রকৃত সত্য অনুধাবনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি দাবি করেন, ইরানকে একটি হুমকি হিসেবে তুলে ধরার যে চেষ্টা চলছে, তা ঐতিহাসিক বাস্তবতা বা বর্তমান পরিস্থিতির সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা লোটা, সামরিক আধিপত্য বজায় রাখা, অস্ত্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং কৌশলগত বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্যই ইরানকে শত্রু হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাসের মাথায় ইরানের প্রেসিডেন্ট চিঠিটি প্রকাশ করলেন। এর আগে বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের নতুন সরকার যুদ্ধবিরতি চেয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ট্রাম্পের এই দাবিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। পেজেশকিয়ান তার চিঠিতে সরাসরি ট্রাম্পের এ দাবির উল্লেখ না করলেও স্পষ্ট করেছেন, আমেরিকা বা ইউরোপসহ কোনো দেশের জনগণের প্রতিই ইরানিদের কোনো শত্রুতা নেই।
চিঠিতে পেজেশকিয়ান ইরানের শান্তিকামী অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, আধুনিক ইতিহাসে ইরান কখনোই আগ্রাসন, সম্প্রসারণবাদ বা উপনিবেশবাদের পথ বেছে নেয়নি। সামরিক দিক থেকে অনেক প্রতিবেশীর চেয়ে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও এবং বারবার দখলদারিত্ব ও আগ্রাসনের শিকার হলেও ইরান কখনোই নিজে থেকে যুদ্ধ শুরু করেনি; বরং সাহসিকতার সাথে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের চারপাশের অঞ্চলে বিপুল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং সেখান থেকে চালানো সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রমাণ করে, আমেরিকার এই সামরিক উপস্থিতি কতটা হুমকিস্বরূপ। পেজেশকিয়ান বলেন, এ পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা যেকোনো দেশের জন্যই স্বাভাবিক। ইরান যা করেছে তা কেবলই বৈধ আত্মরক্ষার অধিকার, কোনোভাবেই যুদ্ধ বা আগ্রাসনের সূচনা নয়।
এ যুদ্ধ সত্যিই মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করছে কি না, চিঠিতে সেই প্রশ্নও তুলেছেন পেজেশকিয়ান। তার অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো অপরাধ থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরাতেই ইসরায়েল ইরানকে একটি হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রক্সি বা ছায়া হয়ে এ যুদ্ধে জড়িয়েছে। তিনি মার্কিনিদের প্রশ্ন করেন, আমেরিকা ফার্স্ট নীতি কি সত্যিই বর্তমান মার্কিন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে? অপপ্রচারের ওপর বিশ্বাস না করে, যারা ইরান ঘুরে গেছেন তাদের সাথে কথা বলার এবং পশ্চিমা বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে সফলতার সাথে কাজ করা মেধাবী ইরানি অভিবাসীদের দিকে তাকানোর আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশই হামলার কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, হামলাগুলো ছিল আত্মরক্ষামূলক বা আগাম সতর্কতামূলক। যদিও ইরান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন কোনো প্রমাণ তারা এখনো হাজির করতে পারেনি। হামলার কয়েকদিন পর ট্রাম্প এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, তার মনে হয়েছিল ইরান আগে হামলা করতে পারে, তাই তিনি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি তিনি এ-ও বলেছিলেন, তিনি হয়তো ইসরায়েলকে এ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিলেন। তবে জনমত জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। রিপাবলিকানদের একটি অংশের সমর্থন থাকলেও, যুদ্ধ শুরুর এক মাস পরেও এ সংঘাত বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিক এর বিরুদ্ধে।
তথ্যসূত্র: টাইম
ডিবিসি/এএমটি