যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর পূর্বশর্ত হিসেবে সব ফ্রন্টে যুদ্ধাবসান, নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাতিলের দাবি জানিয়েছে ইরান। সোমবার (১৮ মে) ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি দেশটির সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশন-এর সদস্যদের এক ব্রিফিংয়ে এই শর্তগুলোর কথা জানান।
কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এই সংসদীয় অধিবেশনের বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনা এবং দুই পক্ষের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া প্রস্তাবগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ির ভাষ্যমতে, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
সব ফ্রন্টে যুদ্ধাবসান: লেবাননসহ চলমান সমস্ত ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: ইরানের চারপাশের অঞ্চল থেকে সমস্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।
অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা মুক্তি: ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নিতে হবে এবং সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে।
সম্পদ অবমুক্তকরণ: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের যাবতীয় আর্থিক সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রশাসনের কাছে একটি নতুন ১৪ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। তবে ইরানের পাঠানো এই সর্বশেষ প্রস্তাবের বিপরীতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা জবাব পাওয়া যায়নি।
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘারিভাবাদি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কখনোই এই যুদ্ধ চলাকালীন ওয়াশিংটনের সাথে আগ বাড়িয়ে আলোচনার চেষ্টা করেনি; বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে যুদ্ধবিরতি এবং পরোক্ষ আলোচনার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল।
জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশন মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি বলেন, বৈঠকে এই বিষয়টিও জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই ৪০ দিনের যুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই চূড়ান্ত বিজয়ী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী (ইসরায়েলি) শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হয়েছে।
অধিবেশন চলাকালীন সংসদীয় কমিশনের সদস্যরা আলোচনা প্রক্রিয়ায় ইরানি প্রতিনিধি দলকে কোনো অবস্থাতেই দেশের জনগণের ন্যায্য দাবি থেকে পিছু না হটার আহ্বান জানান। তারা প্রতিনিধি দলকে বিজয়ীর অবস্থান থেকে দরকষাকষি করার পরামর্শ দেন।
পাশাপাশি, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার উদাহরণ টেনে মার্কিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাসের ব্যাপারে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। সংসদ সদস্যরা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিকভাবে এই ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবি তোলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক বৈরী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এর বিরুদ্ধে কঠোর ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানানো হয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক আদালত ও ফোরামগুলোতে জোরালোভাবে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়। কমিশনের মতে, যুদ্ধ থেকে অর্জিত কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতাগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা শুরু করে। এর প্রায় আট মাস আগেও তারা দেশটির ওপর উসকানিহীন হামলা চালিয়েছিল। জবাবে ইরান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ইসরায়েলের দখলকৃত অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
পরবর্তীতে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক দাবির মুখে ইসলামাবাদে চলমান পরবর্তী শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে।
সূত্র: প্রেস টিভি
ডিবিসি/এসএফএল