মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামির পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতায় কারাভোগ করা নিরপরাধ সোনা মিয়াকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে তিনি কারাগার থেকে বের হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুর রহিমের আদালত চারটি শর্তে সোনা মিয়াকে কারামুক্তির আদেশ দেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার সকালে তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর সোনা মিয়াকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা। স্ত্রী, সন্তান ও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরে স্বজনেরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।
কারামুক্তিতে সহযোগিতাকারী সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সোনা মিয়া বলেন, কারাগারের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে দিনের মতো এবং প্রতিটি দিন বছরের মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে। ঘটনার শুরুতেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে তাকে এমন পরিণতির শিকার হতে হতো না বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।
একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে মিথ্যা ও সাজানো ঘটনায় আসামি করার নিন্দা জানিয়ে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, সোনা মিয়া একজন খেটে খাওয়া মানুষ এবং কোনো অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না। মামলার প্রকৃত আসামি রমজান আলী নিজেকে বাঁচাতে আয়নাবাজির মতো পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ১ মার্চ। ওই দিন রামু ও কক্সবাজার সদর এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মিজানুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। আটকের সময় এক ব্যক্তির পকেটে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদ ও তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে দুই নম্বর আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালের ১৩ জুন মাদক মামলায় কারাবন্দী থাকা সোনা মিয়া পরিচয়ধারী রমজান আলী কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ওই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায় ঘোষণার পর গত ২৩ জুন গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে র্যাব-১৫-এর একটি দল চকরিয়ার ডুলাহাজারা থেকে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে তিনি কারাগারে যাওয়ার পরই তার পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দেয়। একপর্যায়ে সামনে আসে অন্য ব্যক্তির পরিচয়ে মামলা ও জামিন নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
কারাগারে যাওয়ার দুই থেকে তিন দিন পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে আবেদন করে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। এরপর জেল সুপার মামলাটিতে আগে জামিনে মুক্তি পাওয়া সোনা মিয়া এবং বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার ছবি, আঙুলের ছাপ, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করেন। এতে দুই ব্যক্তির তথ্যের মধ্যে গরমিল পাওয়া যায়।
পরে জেল সুপার বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা ও দায়রা জজকে জানান। আদালত ঘটনা যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সার্বিক তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে আদালত চারটি শর্তে সোনা মিয়াকে কারামুক্তির আদেশ দেন।
অন্য ব্যক্তির অপরাধ ও পরিচয় জালিয়াতির কারণে মৃত্যুদণ্ডের মামলায় কারাভোগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে এখন নতুন করে জীবন শুরু করতে চান সোনা মিয়া। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে ভবিষ্যতে আর কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে যেন এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয় এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন তিনি, তার স্বজন এবং স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।
ডিবিসি/এমএনকে