মহানবি (স:) এর আগে অবতীর্ণদের মধ্যে যিশুকে সবচেয়ে সম্মানিতদের অন্যতম বলে স্থান দিয়েছে কোরান। কোরানে অসংখ্যবার উল্লিখিত হয়েছে যিশুর (যাকে আরবিতে বলা হয় ঈসা) নাম, নবি মোহাম্মদ (স:) এর নামের চেয়েও বেশিবার। তাই যিশুর জন্মদিন পালন না করলেও মুসলমানরা তাদের ধর্ম বিশ্বাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যিশুকে গভীরভাবে সম্মান করেন।
ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরানে নাম ধরে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন নারী আছেন মাত্র একজন। তিনি হচ্ছেন কুমারী মাতা মেরি। আরবিতে তার নাম মরিয়ম।
মেরি বা মরিয়মের নামে কোরানের একটি পূর্ণাঙ্গ সুরার নামকরণ হয়েছে - যাতে কুমারীর গর্ভ থেকে যিশুর জন্মের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
তবে ইসলামের এই কাহিনিতে কোনো জোসেফের উল্লেখ নেই, নেই কোন যিশুর জন্মের বার্তাবাহী জ্ঞানী ব্যক্তি বা পশুর আস্তাবলের কথাও। এখানে আছে, একটি মরা খেঁজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে মেরি একাই যীশুর জন্ম দিয়েছিলেন মরুভূমিতে। সেখানে তার খাবার জন্য গাছ থেকে পাকা খেঁজুর পড়ে, এবং তার পায়ের কাছে পানির ধারার সৃষ্টি হয়।
একজন অবিবাহিত নারী সন্তান জন্ম দেবার ফলে তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু যিশু - নবজাত শিশু অবস্থা থেকেই ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হিসেবে কথা বলতে শুরু করেন। এই যাদুকরী ঘটনার পর তার মায়ের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা থেমে যায়। এটি হচ্ছে সংস্কারের ওপর বিজয়ের এক গল্প।
মুসলিমরা যখন যিশুর নাম নেন, তখন তাদের 'তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক' বলতে হয়। তা ছাড়া মুসলিম ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী শেষ বিচারের দিনের আগে - ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যিশুকে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
মুসলিম সাহিত্যে তাকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে, তা শুধু কোরানেই সীমিত নয়।
সুফি দার্শনিক আল-গাজ্জালি যিশুকে বর্ণনা করেছেন 'আত্মার নবি' বলে। ইবনে আরাবি তার সম্পর্কে লিখেছেন 'সন্তদের নিশানা' হিসেবে। মুসলিম বিশ্ব জুড়েই ঈসা এবং মরিয়মের নামে শিশুদের নাম রাখা হয়।
ইসলাম ধর্মের সাথে যিশুর পরিচয়ের ঐতিহাসিক কারণ আছে। ধর্ম হিসেবে ইসলামের জন্ম হয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে। ততদিনে মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিস্টান ধর্ম ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাইবেলে নবি মোহাম্মদের কোন উল্লেখ নেই।
কিন্তু ইসলাম যদিও যিশুকে সম্মান করে, খ্রিস্টান চার্চ সবসময় এ অনুভূতির সদয় প্রত্যুত্তর দেয়নি। ইতালির বোলোনায় পঞ্চদশ শতকের স্যান পেত্রোনিও গীর্জায় একটি দেয়ালচিত্র আছে, যাতে ইসলামের নবীকে দেখানো হয়েছে নরকে, তার ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। ইউরোপে এমন অনেক শিল্পকর্ম আছে, যাতে তাকে অবমাননার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
অবশ্যই বলতে হবে - এ যুগে ইসলাম সম্পর্কে খ্রিস্টান চার্চের অবস্থান মোটেও এরকম নয়। সময় বদলে গেছে, কিন্তু আমাদের এই যুগে নতুন সব ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, বিদ্বেষমূলক সংস্কার, এবং উগ্রপন্থী সহিংসতার জন্ম হয়েছে।
২০০২ সালে বোলোনার চার্চের দেয়ালচিত্র বোমা মেরে উড়িযে দেবার ষড়যন্ত্রের জন্য ইসলামী জঙ্গীদের সন্দেহ করা হয়। বোলোনার ওই ঘটনার পরবর্তীকালে ইসলামের নামে ইউরোপে এবং বহু মুসলিম দেশেও বড় বড় আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে - যাতে বহু লোকের মৃত্যু হয়েছে। এগুলোর ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সম্প্রীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
সে কারণেই মুসলিমদের মধ্যে যিশুকে কীভাবে চিত্রিত করা হয়, এবং তার গুরুত্বই বা কী - এটা উপলব্ধি করাটা হয়তো আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তা খ্রিস্টানদের জন্য যেমন, তেমনি মুসলিমদের জন্যও।
নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে - তা দূর করার একটা ভালো পন্থা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যেসব অভিন্ন ব্যাপার আছে তা তুলে ধরা।