ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির বাবা ও তাঁর দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসি আর নেই। আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে। এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক নেপথ্য অধ্যায়ের। ছেলের ছায়া হয়ে থাকা হোর্হে মেসি কেবল একজন জন্মদাতাই ছিলেন না, বরং লিওনেল মেসির আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে সবচেয়ে বড় রূপকার ছিলেন তিনি।
হোর্হে মেসি নিজেও একসময় নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুবদলে খেলতেন। কিন্তু সামরিক চাকরির বাধ্যবাধকতায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে তিনি আকিন্দার ইস্পাত কারখানায় কাজ শুরু করেন এবং পরিশ্রমে ব্যবস্থাপক পদে উন্নীত হন। ছেলে লিওনেল যখন ১০ বছর বয়সে হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, তখন প্রতি মাসে ১৫০০ ডলারের চিকিৎসা খরচ মেটানো এই মধ্যবিত্ত বাবার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। নিওয়েলস ক্লাব সাহায্য করতে ব্যর্থ হলে হোর্হে নিজের জমানো টাকা ও কারখানার সাহায্যে ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে যান।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেসির জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের একটি ভিডিওটেপ স্পেনে পৌঁছালে বার্সেলোনার নজর কাড়ে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে হোর্হে মেসি ছেলেকে নিয়ে জীবনের প্রথম উড়োজাহাজে চেপে স্পেনে পাড়ি জমান। শুরুতে চুক্তি নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হতাশ হয়ে দেশে ফেরার কথাও ভেবেছিলেন হোর্হে। অবশেষে এজেন্ট মিনহেলার চাপে বার্সেলোনার কর্মকর্তা কার্লেস রেশাক একটি পেপার ন্যাপকিনে চুক্তির কথা লিখে ফুটবল ইতিহাস বদলে দেন। বার্সেলোনায় শুরুর দিনগুলো ছিল বাবা ও ছেলের জন্য চরম একাকিত্বের। দুজনেই একা ঘরে কাঁদতেন, কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দিতেন না। ছেলের স্পেনে থাকার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে হোর্হে তাঁর পাশেই থেকে যান।
চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই হোর্হে মেসি ছেলের এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তির নবায়ন থেকে শুরু করে পিএসজি ও সবশেষ ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার পেছনে মূল কান্ডারি ছিলেন তিনি। প্রচারের আলোর বাইরে থাকতে পছন্দ করা হোর্হে ব্র্যান্ড মেসিকে বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করিয়েছেন। তিনি মাত্র কয়েকটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলত পারিবারিক ছবিই পোস্ট করতেন।
বিশ্বকাপগুলোতে গ্যালারিতে পুরো মেসি পরিবারের উপস্থিতি নিয়মিত দৃশ্য হলেও, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে হোর্হে মেসির অনুপস্থিতি সবার নজরে আসে। এই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই গোল করার পর মেসি কেঁদে ফেলেছিলেন। হ্যাটট্রিকের পর তিনি জানান, খেলার বাইরের কিছু কঠিন সময় পার করছেন তিনি। পরে জানা যায়, হোর্হে মেসি অসুস্থ। মেসি পরিবার এর আগে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল তিনি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আছেন এবং অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিরবিদায় নিলেন হোর্হে মেসি। তাঁর মৃত্যুতে ফুটবল বিশ্ব কেবল একজন তারকার বাবাকেই হারাল না, হারাল এমন একজনকে যিনি নিজের স্বপ্ন ও স্বস্তির জীবন ত্যাগ করে ছেলের অনিশ্চিত পথে সারা জীবন ছায়া হয়ে ছিলেন।
ডিবিসি/এফএইচআর