দেরিতে রিপোর্ট পাওয়ায় তদন্তে বাধা।
একটি মরদেহের ময়নাতদন্ত থেকে ভিসেরা পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে হত্যার মূল ঘটনা ধামাচাপা এবং আসামীরা গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ পেয়ে যান। বিচারিক প্রক্রিয়াতেও বাড়ে দীর্ঘসূত্রতা। মর্গ নিয়ে হিমেল মাহবুব এর ধারবাহিক রিপোর্টের আজ সপ্তম পর্ব।
২০১৬ সালের ২০শে নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার ভাড়া বাসা থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দিয়াজের মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্তে হত্যার কোন আলামত পাওয়া যায়নি।পরে ৬ই ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে আবারো ময়নাতদন্ত করা হয়। তার প্রতিবেদনে বলা হয়, দিয়াজকে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে।চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ভবিষ্যতে যদি কোন প্রশ্ন থাকে ওই ময়নাতদন্তের প্রফেসররা যারা রিপোর্ট করেছে এবং ঢাকায় যিনি করেছেন দরকার হলে আদালতে ডেকে কেন ভ্যারিয়েশন হয়েছে তার উত্তর দিতে হবে।
রিপোর্ট কোনটি সঠিক তা যাচাই করবে আদালত। তবে ময়নাতদন্তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, প্রভাব খাটানো, ডোমের ভুলসহ নানা কারণে রিপোর্টে গড়মিল হওয়ার আশংঙ্কা থাকে।এ বিষয়ে শরিয়তপুর সদর হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী জেসমিন আক্তার নিপা বলেন, ‘দুই জনের ময়নাতদন্তের সময় ডোম ভিসেরা নমুনা উল্টাপ্লাল্টা করে ফেলেছিলো। কাজটি হয়েছে শুধু ডোম শিক্ষিত নয় বলে। সে লিখে রাখেনি। এরকম মাঝে মাঝেই ভুল হয়’। ঢাকা মেডিক্যালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “ময়নাতদন্ত করতে স্যাম্পল সংগ্রহের যে কিট থাকে তা অনেক জায়গায়ই পাওয়া যায় না। এ জিনিসটার জন্য অনেক সময় ব্লাডটা সংরক্ষণ হচ্ছে না। ব্লাড যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ না হয় তাহলে ওই রিপোর্টে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একটি ভুল রিপোর্টের জন্য কারও ফাঁসি হয়ে যেতে পারে, আবার প্রকৃত অপরাধী খালাস পেতে পারে”।
অনেক সময় ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা, দীর্ঘদিন পরে পাঠানোসহ নানা কারণে রিপোর্টে হেরফের হতে পারে। এছাড়া, ভিসেরা পরীক্ষা শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে হয় বলে রিপোর্ট দিতে অনেকদিন লেগে যায়। খুলনা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মোহাম্মদ মেহেদী নেওয়াজ বলেন, “যেখানে আমরা ভিসেরা পরীক্ষা করতে পাঠাই, রিপোর্ট পেতে এক থেকে দুই মাস সময় লেগে যায়। এগুলো খুব বেশি হলে তিন থেকে চারদিন লাগার কথা।দুর্ঘটনা, ময়নাতদন্ত তারপর তার রিপোর্ট আসা এর মাঝখানে অনেক মধ্যশর্তভোগী ঢুকে যায়।তারা এটাকে ম্যানুপুলেট করার জন্য প্রচুর সময় পাচ্ছে। এরমধ্যে দিয়ে আইন ও বিচার প্রক্রিয়া বাধগ্রস্থ হচ্ছে”।
ক্যামেরায় না কথা বললেও সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ভিসেরা পরীক্ষায় কোনো বিষক্রিয়া কিংবা রাসায়নিক পদার্থ আছে কিনা দেখা হয়- এরজন্য সবমিলিয়ে সর্ব্বোচ্চ সাতদিন লাগার কথা।
আইনজীবিরা বলছেন, সময়মতো ময়না তদন্ত প্রতিবেদন হাতে না আসায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। জটিলতা বাড়ছে বিচারিক কাজে। খুলনা মহানগর জজ কোর্ট পিপি কে এম ইকবাল হোসেন বলেন “ ময়নাতদন্তের জন্য সবকিছু ডিজিটাল এবং আধুনিক করা দরকার, কারণ ময়নাতদন্তের ক্রুটির কারণেই অনেক আসামী খালাস পেয়ে যায়”। নড়াইল জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট উত্তম কুমার ঘোষ বলেন “ পুলিশের সুরতহাল রিপোর্ট এবং চিকিৎসকের ময়নাতদন্ত রিপোর্টের সাথে মিল না থাকার কারণে অনেক মামলা দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন আছে”। নাটোর জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ভাস্কর বাগচী বলেন, “ফৌজদারি মামলাগুলো সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে হয়। ফরেনসিক রিপোর্টে সামাণ্য ভুলের কারণে আসামীলা খালাস পেয়ে যেতে পারে”।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ডিজিটালাইজ করার পাশাপাশি প্রত্যেক বিভাগে ভিসেরা পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে বিচারিক কাজ আরো গতিশীল হবে বলে মনে করেন তারা।