স্বামীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মাত্র চার শতক জমি ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার চাপাতলা গ্রামের বিধবা নারী লিপিকা তরফদার। জমি জোরপূর্বক দখল, বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের ভয়, হুমকি ও ভয়ভীতির কারণে তিনি নিজ বাড়িতেও থাকতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। এমনকি নিজের জমি বিক্রি করতে গেলেও বাধার মুখে পড়ছেন বলে দাবি তার।
লিপিকা তরফদার উপজেলার চাপাতলা গ্রামের মৃত স্বরজিৎ তরফদারের স্ত্রী। তার অভিযোগ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয় এক বিএনপি নেতার প্রভাব ও হুমকির কারণে একপর্যায়ে নিজের বসতভিটা ছেড়ে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
এ ঘটনায় বন্দবিলা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাশেম ডাক্তারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে বাঘারপাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন লিপিকা। অভিযোগে অন্য যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন প্রতিবেশী সেলিম, জিল্লুর রহমান, অমিত, সিরাজুল ইসলাম ও বরুন তরফদার।
লিপিকার দাবি, তার স্বামীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া চার শতক জমি প্রতিবেশী অমিত জোরপূর্বক ভোগদখল করে আসছেন। জমিটি ছেড়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিতে বললে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি খুন-জখমের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্বামীহারা লিপিকার ভাষ্য, নিজের বৈধ সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি এখন সেটি ভোগ করতে পারছেন না, আবার নিরাপদে বসবাসও করতে পারছেন না। ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজের বাড়িতে থাকার সাহসও পাচ্ছেন না তিনি। বাধ্য হয়ে অন্যত্র ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে।
লিপিকা অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতা হাশেম ডাক্তার ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেন। এরপর পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হয়ে ওঠে। নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন তারা। এখন জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সেটিতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে তার অভিযোগ।
জমির বিরোধ মেটাতে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান লিপিকা। সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একজন আমিন দিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি পরিমাপ করা হয়। পরিমাপ শেষে জমির সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করা হয়।
এ সময় হাজী মোহাম্মদ মহসিন শেখ, জুলফিকার আলী ও গোলাম রসুলসহ স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন লিপিকা। তার দাবি, সবার উপস্থিতিতে জমির সীমানা নির্ধারণের পরও অভিযুক্তরা নানা টালবাহানা করে জমি বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে তিনি থানার দ্বারস্থ হয়েছেন।
লিপিকা তরফদার বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর এমনিতেই অসহায় অবস্থায় আছি। এখন স্বামীর রেখে যাওয়া জমিটুকুও যদি ভোগ করতে না পারি, তাহলে কোথায় যাব? নিজের বাড়িতেও ভয়ে থাকতে পারছি না। জমি বিক্রি করে অন্য জায়গায় চলে যেতে চাইলেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমি শুধু আমার জমিটুকু ফিরে পেতে এবং নিরাপদে বাঁচতে চাই।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বন্দবিলা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাশেম ডাক্তার। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কোনো জমি দখলের বিষয়ে ইন্ধন দিইনি। আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হচ্ছে। প্রতিবেশীদের ব্যক্তিগত সমস্যায় আমার কোনো ভূমিকা নেই।’
এ বিষয়ে বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ জালাল আলম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’
স্থানীয়ভাবে জমি পরিমাপ ও সীমানা নির্ধারণের পরও বিরোধের সমাধান না হওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন লিপিকা। স্বামীহারা এই নারীর এখন একটাই প্রত্যাশা প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে অভিযোগ তদন্ত করে তার জমির অধিকার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ডিবিসি/এমএনকে