মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ব্যাধি হিসেবে পরিচিত যক্ষ্মা বা ‘হোয়াইট প্লেগ’ যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে প্রকোপ ছড়াতে শুরু করেছে। কোভিড-১৯ এর চেয়েও মারাত্মক এই রোগটি ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে বলে জানা গেছে।
নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন দশকের নিম্নমুখী প্রবণতাকে পেছনে ফেলে ২০২০ সালের পর থেকে দেশটিতে যক্ষ্মার সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। এর ফলে বিশ্বে সংক্রামক রোগ হিসেবে যক্ষ্মা পুনরায় তার এক নম্বর অবস্থান ফিরে পেয়েছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্রে এর সংক্রমণের হার এখনও বেশ কম।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে মোট ১০ হাজার ২৬০ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল নিউইয়র্কেই ৯৬৭ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একটি বড় সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, যক্ষ্মার লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু বা আরএসভি-এর মতো হওয়ায় রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা যায় না এবং চিকিৎসায়ও দেরি হয়। যত বেশি সময় এটি অশনাক্ত থাকে, তত দ্রুত এটি অন্যের মধ্যে ছড়ানোর সুযোগ পায়। একইসঙ্গে, যক্ষ্মার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, যা চিকিৎসাকে আরও জটিল করে দেয়। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পেলে এই প্রতিরোধযোগ্য রোগটি থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব।
‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস’ নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্ট এই রোগটি মূলত বায়ুবাহিত। আক্রান্ত ব্যক্তি কথা বললে, হাঁচি বা কাশি দিলে বাতাসের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এটি সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। যক্ষ্মা প্রধানত ফুসফুসকে আক্রমণ করলেও এটি মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড এবং কিডনিসহ শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই প্রাণঘাতী ব্যাধিটির মূলত দুটি অবস্থা থাকে। প্রথমটিতে রোগীর শরীরে উপসর্গ দেখা যায় এবং তিনি রোগটি ছড়াতে পারেন। এই অবস্থায় চিকিৎসা না করালে ফুসফুসে সক্রিয় যক্ষ্মায় আক্রান্ত একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, যার মধ্যে তার কাছের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরাই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
রোগটির দ্বিতীয় অবস্থাটি হলো সুপ্ত অবস্থা। এই পর্যায়ে শরীরে ব্যাকটেরিয়া নিষ্ক্রিয় থাকে বলে রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না এবং তিনি সংক্রমণও ছড়ান না। তবে কোনো কারণে যদি ওই ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এই সুপ্ত ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। সাধারণত ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে দেখা যায়।
সিডিসির একটি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের শরীরে বর্তমানে সুপ্ত যক্ষ্মা রয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে শনাক্ত হওয়া যক্ষ্মা রোগীদের ৮০ শতাংশেরও বেশি মূলত এই দীর্ঘস্থায়ী ও চিকিৎসাবিহীন সুপ্ত সংক্রমণ পরবর্তীতে সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণেই আক্রান্ত হয়েছেন।
ডিবিসি/এফএইচআর