যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে অবিলম্বে চলমান সহিংসতা বন্ধ করে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের (এফও) সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এই আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন যে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিটি বর্তমানে চরম হুমকির মুখে রয়েছে। গত মাসে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর বাস্তবায়ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি জানান, ২০ জুন মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতারের জারি করা যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, পাকিস্তান সব পক্ষকে সহিংসতা বন্ধ করতে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করে যাবে। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, পাকিস্তান সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ করে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবারও উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং এর জবাবে ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করে।
সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্রগামী নৌচলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। রবিবার ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। ফলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা মঙ্গলবার চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সংঘাতের কারণে পাকিস্তানেও গত ১০ জুলাই পেট্রোল ও হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ১৩ রুপির বেশি বাড়ানো হয়েছে।
উত্তেজনা প্রশমন এবং পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানে পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১০ জুলাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ কাতারের আমির এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি উভয় নেতাকে কষ্টার্জিত শান্তির অর্জন বিপন্ন না করার আহ্বান জানান।
পাশাপাশি, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আঞ্চলিক শান্তি ফেরাতে সৌদি ও ইরানি সমকক্ষদের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলকে গভীরভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। গত ৮ই জুলাই থেকে পুনরায় লড়াই শুরু হওয়ায় ১৮ই জুন স্বাক্ষরিত চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি যুদ্ধবিরতিকে কার্যত শেষ বলে মনে করলেও আরও আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের শিশু যৌন নিপীড়নকারী চক্রের মূল হোতা শাব্বির আহমেদের মামলার বিষয়েও পাকিস্তানের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। মুখপাত্র আন্দ্রাবি জানান, এই মামলার সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি ব্রিটেনের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়। শাব্বিরের ব্রিটিশ-পাকিস্তানি দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলেও, ২০১২ সালে একাধিক শিশু যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়।
পাকিস্তান এই জঘন্য অপরাধের কঠোর নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ওই ব্যক্তি তার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন যুক্তরাজ্যে কাটিয়েছেন এবং ব্রিটিশ ভূমিতেই অপরাধ করেছেন। তাই এর দায়ভার তার বেড়ে ওঠার পরিবেশের ওপরই বর্তায়। এর জন্য বাহ্যিক কারণ খোঁজার পরিবর্তে গভীর আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন। ওই ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থা বা প্রত্যর্পণের যেকোনো সিদ্ধান্ত একচেটিয়াভাবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত বলে পাকিস্তান সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
সূত্র: ডন
ডিবিসি/এমএনকে