বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি ও সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এখন সময়োপযোগী ও সাহসী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত এক যুগে ডলারের বিপরীতে টাকার মানের ব্যাপক অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০০৯ সালে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৬৮ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় ১২৫ টাকায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটির কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি প্রস্তাবনা গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দেশের অফিস ও আদালতের কার্যক্রম সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা এবং সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিনের পরিবর্তে কেবল শুক্রবার রাখা হলে মাসিক কার্যদিবস উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে শুক্র ও শনিবার ছুটি থাকায় এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশে রবিবার ছুটি থাকায় আন্তর্জাতিক কার্যদিবসের সাথে যে তিন দিনের ব্যবধান তৈরি হয়, তা দুই দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এতে বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিনিয়োগ প্রবাহে গতিশীলতা আসবে। এছাড়া সকালভিত্তিক কর্মঘণ্টা চালু হলে মানুষের ভোরে ওঠার অভ্যাস গড়ে উঠবে যা স্বাস্থ্যগতভাবে উপকারী এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। দীর্ঘ ছুটির কারণে তৈরি হওয়া অলস সময় ও ব্যক্তিগত ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি এটি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কর্মক্ষমতা রক্ষায় রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে তারা রাতজাগা অভ্যাস পরিহার করে সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করতে পারে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিটি উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়ে জাতীয় গ্রিডের পরিবর্তে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে।
সকাল ৭টায় অফিস শুরু হলে প্রাকৃতিকভাবে শীতল আবহাওয়ার কারণে অফিস ও যানবাহনে এয়ার কন্ডিশনার বা এসির ব্যবহার কমবে, যা জাতীয় পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কর্মঘণ্টার এই পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসার ঘটানো সম্ভব হলে সরকারের মাসিক রাজস্ব আয় কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে এ ধরনের আমূল সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাবে।
ডিবিসি/টিবিএ