আন্তর্জাতিক, বিবিধ, জাতীয়, লাইফস্টাইল

মহার্ঘ রক্তচন্দনের সাতসতের

মুজাহিদ অভিমন্যু

ডিবিসি নিউজ

রবিবার ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১১:৩৪:৩৪ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

আসলে লাল চন্দনের বাংলা নাম রঞ্জনা। ইংরেজি নাম রেড স্যান্ডার্স। বৈজ্ঞানিক নাম Pterocarpus santalinus। এছাড়াও এটি পরিচিত ইয়েররা চন্দনাম, চেন চেন্দনাম নামেও। কিন্তু লাল চন্দন নামের রঞ্জনার রয়েছে নানা গুণ যা বলে শেষ করা যায় না। 


চন্দন ভারতীয় একটি গাছ বলে ধারনা করা হচ্ছে। রামায়ণ, মহাভারত এমনকি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও উল্লেখ পাওয়া যায় লাল চন্দনের। তবে কেউ কেউ মনে করেন চন্দনের আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপে।

শ্বেত চন্দন ভালো জন্মে ভারতের কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও উত্তর প্রদেশ। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যাতেও চন্দন দেখা যায়। বাংলাদেশে শ্বেত চন্দন পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়।

তবে রক্ত চন্দন সবচেয়ে বেশি জন্মে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু সীমান্তবর্তী নেলোর, কুরনুল, চিত্তুর, কুদ্দাপাহ/ কাডাপ্পা সংলগ্ন বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলে। পৃথিবীর অন্য কোথাও রক্ত চন্দন গাছ না হওয়ার মূল কারণ আবহাওয়া এবং মাটির গুণাগুণের তারতম্য।

মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তারতম্যের কারণেই মারা যেতে পারে লাল চন্দন। বিরল এই গাছটি কেবল ভারতের এই অঞ্চলে জন্মানোর মূল কারণ এটিই। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশে অল্প পরিমাণ রক্ত চন্দন দেখা যায়। 

একেকটি রক্ত চন্দন গাছের উচ্চতা হয় ৮-১২ মিটার। এদের পাতা ৩ থেকে ৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ফুল হলদে।

সাদা চন্দনে সুঘ্রাণ থাকলেও রক্তচন্দনে কোনও গন্ধ নেই। কিন্তু এর কাঠের বিশেষ গুণের জন্য বিশ্বজুড়ে এটির বিপুল চাহিদা। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১৮ সালে এই গাছকে 'বিলুপ্তপ্রায়' প্রজাতির তালিকাভুক্ত করেছে। ভারতে এই কাঠ এত বিপুল পরিমাণে কাটা এবং পাচার হয়েছে যে, মাত্র পাঁচ শতাংশ গাছ অবশিষ্ট আছে। 

ভারতে রক্তচন্দনকে 'লাল সোনা' নামে ডাকা হয়। বিরল প্রজাতির এই উদ্ভিদ স্বর্ণের মতই মূল্যবান। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কাঠের একটি লাল চন্দন। মূলত আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে বিপুল ব্যবহার আছে এই কাঠের। প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বজুড়ে রূপচর্চার অন্যতম উপাদান চন্দন।

ইনস্টিটিউট অফ উড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বলছে, শরীরকে শীতল করতে, জ্বালাপোড়া কমাতে, এবং রক্ত শুদ্ধিকরণে এর জুড়ি মেলা ভার। মাথাব্যথা, চর্মরোগ, জ্বর, ফোঁড়া এবং বিছার কামড়ের চিকিৎসায় ব্যবহার হয় রক্তচন্দন। দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতেও এর অবদান রয়েছে। 

পূজা-অর্চনা, প্রসাধনী  তৈরিতে অনেক আগে থেকেই রক্তচন্দন ব্যবহার হয়ে আসছে। ভারতীয় জার্নাল অফ অ্যাপ্লায়েড রিসার্চের মতে, দামী ভাস্কর্য, বাদ্যযন্ত্র এবং বিলাসবহুল আসবাবের জন্য এই কাঠ ভাল কাঁচামাল। পরিপক্ক লাল চন্দন খুবই দুষ্প্রাপ্য কারণ কয়েকশ বছর লাগে এদের পরিপক্ক হতে। বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ হওয়ায় এই কাঠের ঘনত্ব খুব বেশি। 

তিরুপতির শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, রক্তচন্দন এক ধরনের রঞ্জক উৎপাদন করে যা খাদ্যে এবং ওষুধে ব্যবহারযোগ্য। এই গাছের বাকল এবং কাঠের নির্যাসেরও বেশ কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। জাহাজ নির্মাণ এবং নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের বিকিরণ কমাতে রক্তচন্দন কাঠ ব্যবহার করা হয়।

যার হাজার উপকারি দিক থাকে তার কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকা অসম্ভব নয়। রক্ত চন্দনের ও কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে রক্ত চন্দনের ব্যবহারে তাদের গায়ে র‍্যাশ উঠতে দেখা গেছে। চন্দন খেলে কারও কারও পেটের সমস্যা দেখা দেয়। তবে এর বিরুদ্ধে শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলে নি।  

২০০০ সালে ভারতে রক্ত চন্দন কাটা, বিক্রি, রপ্তানিসহ সকল প্রকার কারবার নিষিদ্ধ করা হয়। তখন থেকে বেড়ে গেছে এই গাছটির চোরাচালানও। তবে পাচারকারীরা কাঠ পাচারের ভিন্ন উপায় বের করেছে। কাস্টমসের যোগসাজশে জাহাজের কন্টেইনার, এয়ার কার্গো বা বিমান যাত্রীদের লাগেজে করে পাচার হয় রক্তচন্দন।

চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অস্ট্রেলিয়ায় রক্তচন্দন কাঠের বিপুল চাহিদা। সবচেয়ে বেশি চাহিদা চীনে। পাচারও তাই বেশি হয় ওই দেশে।

লাল চন্দন পাচার নিয়ন্ত্রণে ভারতে 'রেড স্যান্ডলার্স অ্যান্টি-স্মাগলিং টাস্কফোর্স' গঠন করা হয়েছে। ২০২১ সালে ৫০৮ কোটি টাকার রক্তচন্দন বাজেয়াপ্ত করেছে তারা। গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৪২ জন পাচারকারী।

যেকোন বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে ব্যবসা আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। চোরাচালানের ফলে বৈধভাবে রক্ত চন্দনের ব্যবসার সাথে যারা জড়িত তারাও মার খেয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই গুটিয়ে নিয়েছেন ব্যবসা। 

সম্প্রতি সাড়া জাগানো সিনেমা পুষ্পা দ্যা রাইজ সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে লাল চন্দনের চোরাকারবার নিয়েই।   

আরও পড়ুন